চলতি বছর আগাম আলু চাষে যেমন ধ্বস নেমেছে, তেমনি গতবছর আলুর অধিক ফলন ও দরপতন চাষি ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের কোমড় বেঁকে দিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার আলু চাষির মুখের হাসি। গতবছর অতিরিক্ত আলু চাষই যেন কাল হয়ে দেখা দেয় আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের। মধ্য নভেম্বরে এসেও লাখ লাখ বস্তা আলু হিমাগারে পরে থাকায় কোটি কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন নীলফামারীসহ উত্তর জনপদের হাজার হাজার আলু চাষি ও ব্যবসায়ী। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও।
সূত্র মতে, প্রতিবছর নভেম্বরের শুরুতেই নীলফামারীসহ এ অঞ্চলের হাটবাজারে নতুন আলু উঠতে শুরু করলেও এবছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গতবছরের আর্থিক ধকল কাটিয়ে উঠতে না পারায় এবার আগাম আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এলাকার শতশত চাষি। সামান্য কিছু জমিতে আগাম আলু চাষ হলেও হাজার হাজার বিঘা জমি এখনো অলস পরে আছে। ঝুঁকি নিয়ে কোথাও কোথাও আলু চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা হলেও গত বছরের চেয়ে এবার অর্ধেকেরও কম জমিতে আলু চাষ হবে না বলে ধারনা করা হচ্ছে। গতবছর নীলফামারীসহ বৃহত্তর রংপুরের ৮জেলায় চাহিদার তুলনায় কয়েকগুন বেশী আলু উৎপাদিত হয়।
নীলফামারী কৃষি বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, শুধু নীলফামারী জেলাতেই আলু উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৬ মেট্রিকটন। অথচ বছর জুড়ে গোটা জেলায় চাহিদা মাত্র ৬৫থেকে ৭০হাজার মেট্রিকটন। নীলফামারী জেলার ২টি সরকারিসহ ১১টি হিমাগারে আলু ধারন ক্ষমতাও সীমিত। মাত্র ৮৩ হাজার ২৫০মেটিকটন আলু সংরক্ষন করা যায়। এদিকে হিমাগারের বাহিরে স্থানীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষন করা আলু সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত বাজারে থাকায় হিমাগারের বেশীর ভাগ আলু হিমাগারেই থেকে গেছে। হিমাগার মালিকদের সূত্র অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ৮জেলার প্রায় ৯৪টি হিমাগারে গতবছর ১কোটি ৮৭লাখ ৫০হাজার বস্তা (প্রায় ১১লাখ ২৫হাজার মেট্রিকটন) আলু সংরক্ষণ করা হয়। যার অর্ধেকেরও বেশী আলু এখনো হিমাগারেই রয়ে গেছে। নীলফামারী কৃষি বিভাগে সূত্র অনুযায়ী জেলার ১১টি হিমাগারে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার মেট্রিকটন আলু মজুদ রয়েছে। যা দিয়ে নীলফামারী জেলায় এক বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। আলুর এই দরপতনের ফলে চাষি-ব্যবসায়ী উভয়ে হিমাগারে রক্ষিত আলু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। চাঁদের হাট এলাকার আলু চাষি শহিদুল ইসলাম জানান, মানুষের কাছে টাকা ধার-দেনা করি গত বছর আলু গাড়ি হাজিরার টাকায় ওঠে নাই, লাভতো দূরোত থাউক। একই কথা বলেন, এলাকার সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, চাঁদেরহাটের অংকুর সীড হিমাগারোত ৪০বস্তা আলু থুছুনু সেই আলু বেকেরে পাওনাই। বাজারোত দাম নাই। আলু ব্যাচে বস্তা থোয়ার টাকাও ওঠেছেনা। একই অবস্থা এলাকার শতশত আলু চাষি ও আলু ব্যবসায়ীর। দরপতনের মুখে হিমাগার থেকে আলু বের না হওয়ায় বিপাকে হিমাগার মালিকরাও। নতুন মৌসুম যখন হিমাগারের দরজায় টোকা দিচ্ছে তখন, বিপুল পরিমান আলু নিয়ে হিমাগার মালিকরা চরম অস্থিরতায় ভুগছেন। নীলফামারী সদরের অংকুর সীড এন্ড হিমাগার এবং রংপুরের মিঠাপুকুরে অবস্থিত অংকুর স্পেশালাইষ্ট কোল্ড ষ্টোরেজের ম্যানেজার হায়দার আলী ও হাফিজুর রহমান দুলাল জানান, একই মালিকের অধিনে থাকা এ দুটি হিমাগারে প্রায় ৪লাখ ৬০হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হলেও ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ বা ২লাখ ৭৬ হজার বস্তা আলু বের করেছেন ব্যবসায়ী ও আলু চাষিরা। এর মধ্যে নীলফামারীতে অবস্থিত অংকুর সীড হিমাগার থেকে বের হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ আলু। তারা বলেন, আলুর দরপতনের কারনে হিমাগারে রক্ষিত বিপুল পরিমান আলু নিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। কাংখিত পরিমাণ আলু হিমাগার থেকে বের না হওয়ার কারনে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিলসহ দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো যাচ্ছেনা অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি অপরিশোধিত থাকায় ঋণের বোঝা বাড়ছে। নতুন মৌসুম যখন দোড়গোড়ায়, তখন হিমাগারে আলু সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচাদি বেড়ে কয়েকগুন হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যাংক ঋণের কিস্তি প্রদান। এর পরেও আসছে মৌসুমের প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের এবং ৫লাখ ৩২ হাজার ৬২০মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে আলু উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত সকলকে আর্থিক সহায়তা প্রদান ও হিমাগারের ব্যাংক ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুবিধা প্রদানের কথা বলছেন অনেকেই। না হলে খাদ্য চাহিদার অন্যতম যোগানদানকারী ফসল আলু চাষ ও সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন এলকার কৃষক-ব্যবসায়ী সকলেই।