বাংলাদেশে ফরিদপুর জেলার বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার শ্রী ধাম ওড়াকান্দি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এটি শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান এবং ভক্তদের কাছে পুণ্যস্নান ও আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাঁকুরের ২১৫ তম আবির্ভাব দিবসে মহা বারুণীর স্নান উপলক্ষে এখানে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এসে আধ্যাত্মিক শান্তি লাভ করেন এবং সমাজ সংস্কারের বার্তা গ্রহণ করেন। ১৬ ই মার্চ সোমবার সকাল ৮ টা ২৮ মিনিট হতে ১৭ ই মার্চ মঙ্গলবার সকাল ৮ টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথি থাকায় সমাগত ভক্ত বৃন্দ কামনা সাগরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মহা বারুণীর স্নান করে ।
ভক্ত সমাগমে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২৬ সালে শ্রী ধাম ওড়াকান্দিতে ভক্ত সমাগমে নতুন রেকর্ড গড়লো।
শ্রী ধাম ওড়াকান্দির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ১৮১২ সালে হরিচাঁদ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মতুয়া আন্দোলন শুরু করেন। ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে তিনি ভুক্তভোগী মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে আনেন।
তাঁর নেতৃত্বে মতুয়া সম্প্রদায়ের শিক্ষা, ন্যায্যতা ও আধ্যাত্মিক ঐক্য গড়ে ওঠে।
হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশলতিকা
হরিচাঁদ ঠাকুর
( জন্ম: ১৮১২ খ্রি. | মৃত্যু: ১৮৭৮ খ্রি )
পিতা: যশোমন্ত ঠাকুর
মাতা: অন্নপূর্ণা দেবী
বাসস্থান: শ্রী ধাম ওড়াকান্দি
পুত্র: গুরুচাঁদ ঠাকুর
( জন্ম: ১৮৪৭ খ্রি. | মৃত্যু: ১৯৩৭ খ্রি. )
বাসস্থান: ওড়াকান্দি
পুত্র: প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর । (মৃত্যু: ১৯৯০-এর দশকে
বাসস্থান ( পরবর্তীতে ): পশ্চিমবঙ্গ
পুত্র: কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর
( জন্ম: ১৯৪০-এর দশক | মৃত্যু: ২০১৪ খ্রি.)
বাসস্থান: ঠাকুরনগর ( ভারত )
পুত্র: মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুর
(জীবিত) বর্তমান বাসস্থান: ঠাকুরনগর ভারত
অন্যান্য বংশধর
বাসস্থান: ভারত ( বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ) ও বাংলাদেশ
বংশধরদের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ অংশ: ওড়াকান্দি কেন্দ্রিক ধর্মীয় কার্যক্রম
ভারত অংশ: ঠাকুরনগর কেন্দ্রিক মতুয়া মহাসংঘ
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব দুই দেশেই বিস্তৃত
প্রমথ রঞ্জন ঠাকুরের সঠিক জন্ম-মৃত্যু সাল বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন পাওয়া যায়, তাই আনুমানিক ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে ঠাকুর পরিবারের মূল কেন্দ্র দুইটি—
* বাংলাদেশ: ওড়াকান্দি
* ভারত: ঠাকুরনগর
ধর্মীয় নেতারা, যারা সম্প্রদায়ের সংস্কার ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার রক্ষা করছেন
ভক্তদের মতে, হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধররা এখনও তাঁর দর্শন অনুযায়ী সমাজ সেবার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বার্ষিক বারুণী মেলা, মন্দির ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ধর্মীয় ও দর্শনীয় স্থান
ওড়াকান্দিতে রয়েছে বহু দর্শনীয় স্থান:
ঠাকুর বাড়ি ও আশ্রম: হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান এবং শিষ্যদের জন্য আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
হরি মন্দির, শান্তিলতা মন্দির ও নাট মন্দির: ভক্তদের আধ্যাত্মিক অভ্যুত্থানের স্থান।
কামনা সাগর ও দুধ সাগর: বার্ষিক বারুণী স্নান অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভক্তরা পবিত্র জলে স্নান করে পাপ ধুয়ে মন শান্তি অনুভব করেন।
এখানকার মন্দির ও পুকুর ভক্তদের জন্য অত্যন্ত আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিটি কোণে হরিচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষার ছাপ লক্ষ্য করা যায়।
বারুণী মেলা
প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলা সাধারণত ৩–৫ দিন ধরে চলে এবং এতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও ভারত, নেপাল থেকে হাজার হাজার ভক্ত অংশ নেন।
ভক্তদের বিশ্বাস, এখানে স্নান করলে পাপ ধুয়ে যায় এবং মন শান্ত হয়। ধর্মীয় গান, ঢোল‑নাগাড়ি ও প্রার্থনার মাধ্যমে ভক্তরা আধ্যাত্মিক শক্তি অনুভব করেন।
২০০৫ সালে মেলার সময় স্ট্যাম্পিডে সাতজন ভক্তের মৃত্যু ঘটে, যা নিরাপত্তার গুরুত্ব সামনে এনেছিল। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এখানে পুজো দেন, যা ওড়াকান্দির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করেছে।
ওড়াকান্দি শুধু আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়; এটি শিক্ষা, সামাজিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম, গুরুচাঁদ ঠাকুরের কর্মকাণ্ড, বংশধরদের অবদান এবং বার্ষিক বারুণী মেলা এটিকে বাংলাদেশের প্রধান আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক স্থানের মধ্যে
হিসেবে রক্ষা করছেন।