
অস্ট্রেলিয়ার পার্থে নিজের বাবা-মায়ের কেনা বাড়ির মালিক হওয়ার আশায় দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করেছিলেন এক নারী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাড়ির মালিকানা নিয়েই তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। ব্রিয়ানা লেন নামের ওই নারী পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টে তার বাবা অ্যালান ব্রিগস ও মা ওয়েন্ডি ব্রিগসের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছেন। তার দাবি, ২০১৪ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতেই তিনি এই অর্থ দিয়েছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালে, যখন ব্রিয়ানা ও তার স্বামী বেন লেন আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন। সেই সময় পার্থের ক্ল্যারমন্ট এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকা এই দম্পতি বাড়ি হারানোর আশঙ্কায় ছিলেন। ব্রিয়ানার ভাষ্যমতে, তিনি তখন বাবা-মায়ের কাছে নিজেদের জন্য একটি বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে বাবা-মা ঋণের জামিনদার হতে রাজি না হয়ে নিজের নামে বাড়ি কেনার প্রস্তাব দেন। সেই অনুযায়ী, ২০১৪ সালের নভেম্বরে অ্যালান ও ওয়েন্ডি ব্রিগস পার্থের সোয়ানবোর্ন এলাকায় প্রায় ১১ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার মূল্যের একটি তিন শয়নকক্ষের বাড়ি কেনেন।
ব্রিয়ানার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি ৬৯টি মাসিক কিস্তিতে মোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ৭০০ ডলার পরিশোধ করেন। এরপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্তও তিনি নিয়মিত অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখেন। ব্যাংক লেনদেনের বিবরণে অনেক ক্ষেত্রে এসব অর্থের পাশে ‘মর্টগেজ’ বা কিস্তি হিসেবে উল্লেখ ছিল। তবে বাবা-মায়ের দাবি, বাড়িটি কখনো তার নামে দেওয়ার কোনো লিখিত বা মৌখিক প্রতিশ্রুতি ছিল না। তাদের মতে, ব্রিয়ানা বাড়িতে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন ভাড়াটিয়া হিসেবে এবং তিনি যে অর্থ দিতেন তা মূলত ভাড়ারই অংশ ছিল।
ব্রিগস দম্পতির দাবি, বাড়িটি তারা ১২ বছরের সুদভিত্তিক ঋণে কিনেছিলেন, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মূল ঋণ কমানোর পরিবর্তে মূলত সুদ পরিশোধ করতে হতো। বিরোধটি প্রকাশ্যে আসে ২০২৪ সালে, যখন অ্যালান ব্রিগস তার মেয়েকে জানান যে বাড়িটি তারই মালিকানাধীন এবং ব্রিয়ানা সেখানে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন। এরপর বাড়িটি বিক্রির জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রবেশের অনুমতি দিতে ব্রিয়ানা অস্বীকৃতি জানালে পারিবারিক বিরোধ চরমে পৌঁছায়।
মামলায় ব্রিয়ানার পক্ষে কিছু খুদে বার্তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে অ্যালান তাকে একটি বার্তায় বাড়ি বিক্রির পর বিনিয়োগের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এমনকি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও বাড়ি বিক্রি ও সেই অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি ব্রিয়ানাকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আদালতে এসব বার্তা দুই পক্ষের সম্পর্ক ও বাড়ির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জটিল দিকগুলো উন্মোচন করেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ব্রিগস দম্পতি বাড়িটির জন্য একজন ক্রেতার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। যদিও রায়ে বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করা হয়নি, তবে সম্পত্তির বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ ডলারের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর ৯ জুলাই ব্রিয়ানা অর্থ পরিশোধ বন্ধ করে দেন এবং একই মাসে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে বাড়ি বিক্রি ঠেকাতে সম্পত্তির ওপর বিশেষ আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন জানান।
বিচারপতি স্ট্রক তার রায়ে উল্লেখ করেন, ব্রিয়ানার দাবি এমন একটি গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে যা বিচারযোগ্য, তবে এই পর্যায়ে তার দাবিকে খুব শক্তিশালী বলা যাচ্ছে না। আদালত শেষ পর্যন্ত বাড়ি বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। বিচারপতির মতে, বাড়িটি বিক্রি করা জরুরি ছিল কারণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রি না হলে ঋণের মাসিক পরিশোধের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারত। ব্রিগস দম্পতি আদালতকে জানান, বাড়িটি বিক্রি করতে না পারলে এবং ঋণের পুরো দায় বহন করতে হলে তারা আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়তে পারেন।
তবে আদালত ব্রিয়ানার দাবি পুরোপুরি বাতিল করেননি। বিচারপতি স্ট্রক জানিয়েছেন, বাড়ি বিক্রির পর ঋণ, বিক্রয়সংক্রান্ত খরচ এবং মূলধন লাভ কর পরিশোধের পর আনুমানিক ৮ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। এই অর্থের একটি অংশের ওপর ব্রিয়ানার দাবি থাকতে পারে বলে আদালত মনে করছেন।
এ জন্য ব্রিয়ানাকে ২১ দিনের মধ্যে বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি বিক্রির পর অবশিষ্ট অর্থ আদালতের তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। আপাতত বাড়ি বিক্রির পথ খুলে গেলেও, ১১ বছর ধরে দেওয়া ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি অর্থের পুরো বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। বাড়িটির মালিকানা নিয়ে বাবা-মেয়ের বিরোধ এবং ব্রিয়ানার অর্থ ফেরত বা বিক্রয়লব্ধ অর্থের অংশ পাওয়ার দাবি পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাবা-মায়ের বক্তব্য অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়িটি কটেসলো বিচের কাছাকাছি একটি অভিজাত এলাকায় অবস্থিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিস্তি চালিয়ে যেতে তিনি নিজের অবসরকালীন সঞ্চয় থেকে আরও ১০ হাজার ডলার তোলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই সময় তিনি মোট ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৬২ ডলার দিয়েছেন বলে আদালতকে জানান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাড়িতে অগ্নিকুণ্ড স্থাপন, বৈদ্যুতিক কাজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন কাজে ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আরও ১৯ হাজার ৮০ ডলার খরচ করার দাবিও করেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিছু সময়ে মাসিক ভাড়া মাত্র ৩৩৪ ডলার পর্যন্ত নেমে এসেছিল এবং একপর্যায়ে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ ডলার ভাড়া বকেয়াও হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের মাসিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলার।