
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক শ মানুষ। উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিখোঁজ অস্ট্রেলীয়দের মধ্যে ১৫ জন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভ্রমণ প্রতিষ্ঠান ‘হিমালয়ান গ্লেসিয়ার অ্যাডভেঞ্চার্সের’ একটি দলের সদস্য। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানিয়েছেন, বুধবার সকালের দিকে দলটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ১৫ জনের দলে ৯ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী দুইজনের বয়স ১১ ও ১৪ বছর এবং সবচেয়ে বয়স্ক নারীটির বয়স ৬৪ বছর। তারা কাঠমান্ডু থেকে কৈলাস পর্বত পর্যন্ত ১৪ দিনের একটি তীর্থভ্রমণে বের হয়েছিলেন।
ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দলনেতাদের সঙ্গে তাদের শেষ যোগাযোগ হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী একটি ছোট দল নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হলেও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে তাদের অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক এই বন্যার পর মোট ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, যার মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের তালিকায় ভারতীয় পর্যটকদের নামও রয়েছে। পানি কিছুটা কমলে উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভোতে কোশি নদীর আশপাশের এলাকায় হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। এর সঙ্গে কাদা, পাথর ও বরফ মিশে ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের কারণে তুষারধস বা বরফধসের ধারণা করা হলেও, ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে এটি মূলত বড় ধরনের ভূমিধসের কারণে হয়েছে। বন্যার সময় নদীর পানির উচ্চতা মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়।
দুর্যোগের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নেপালের রাসুয়া জেলায়। জেলার স্যাপ্রুবেশি ও তিমুরে এলাকায় প্রবল স্রোতে বহু বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া নুয়াকোট ও চীনের তিব্বত অংশের গিরং এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গিরং এলাকায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল সেনাবাহিনী ১৪টি হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দল মোতায়েন করে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ নিখোঁজদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অবস্থানরত অস্ট্রেলীয়দের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ নিখোঁজ নাগরিকদের অবস্থান নিশ্চিত করতে নেপালের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
এই দুর্যোগের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের মতে, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ দ্রুত গলছে, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দুর্গম ভূখণ্ড ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হলেও স্থল ও আকাশপথে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আন্তর্জাতিক রেডক্রসের নেপাল প্রতিনিধি ডেভিড ফিশার জানিয়েছেন, পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সূত্র: এবিসি নিউজ অস্ট্রেলিয়া, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল জাজিরা ও নেপাল পর্যটন কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাড়িঘর, সড়ক ও সেতু ভেসে যেতে শুরু করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে দৌড়ে পালাচ্ছেন এবং বিশাল জল ও কাদার স্রোত বসতিতে ঢুকে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ার পর নদীতে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও পানি নেমে এসে এই আকস্মিক বন্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এত দ্রুত পানির উচ্চতা বাড়ায় নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ এবং পর্যটকদের সতর্ক হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও খুব কম ছিল।