
যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিক অধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন 'কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস' বা সিএআইআর তাদের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের 'ব্যাক-টু-স্কুল' রিসোর্স গাইড প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে। এই গাইডের সঙ্গে যুক্ত একটি ৯/১১ বিষয়ক পাঠ্যক্রমে হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া এবং আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনের লেখা 'লেটার টু আমেরিকা'কে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পাঠ্য হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছিল।
২৮ আগস্ট নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টি সামনে আসার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, বিতর্কের মুখে সিএআইআর তাদের গাইড থেকে বিতর্কিত ৯/১১ বিষয়ক উপকরণটি সরিয়ে নিয়েছে। এর আগে ২৪ আগস্ট সিএআইআর তাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানিয়েছিল যে, নতুন শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য তারা এই রিসোর্স গাইড প্রকাশ করেছে। এতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের অধিকার, হয়রানি ও বৈষম্য রোধ, নামাজ ও পোশাকের মতো ধর্মীয় সুবিধা এবং শ্রেণিকক্ষে ৯/১১ ও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার নির্দেশনা ছিল।
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই 'মুসলিম স্টাডিজ কারিকুলাম' মূলত সিএআইআর-এনজে এবং 'টিচিং হোয়াইল মুসলিম'-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২২ সালে তৈরি করা হয়েছিল। সে সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, শ্রেণিকক্ষে ৯/১১ নিয়ে আলোচনার সময় মুসলিম শিক্ষার্থীদের ওপর বৈষম্য ও হয়রানি কমানো এবং ঘটনার পরবর্তী প্রভাব বোঝাতেই এই পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। পাঠ্যক্রমের একটি অনলাইন কপিতে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে আসা বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, নথিতে ৯/১১ হামলার জন্য আল-কায়েদার ভূমিকা স্বীকার করা হলেও হামলাকারীদের সরাসরি 'ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং ঘটনাটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ওসামা বিন লাদেনের ২০০২ সালের চিঠি, যেখানে তিনি হামলার পক্ষে নিজের যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, তা শিক্ষার্থীদের জন্য সুপারিশ করা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। এছাড়া পাঠ্যক্রমে বিন লাদেনকে ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা বিদ্রোহীদের একজন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা তার পরবর্তী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বকে খাটো করে দেখায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই পাঠ্যক্রমের সুপারিশের তালিকায় 'ভি ফর ভেনডেটা' চলচ্চিত্রের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিএআইআর-এর জাতীয় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক কোরি সেলর জানান, শিক্ষার্থীদের ধর্ম পালনের অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং হয়রানি থেকে সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে ৯/১১ হামলায় স্বজন হারানো পরিবার এবং বিভিন্ন ইহুদি কমিউনিটির নেতারা এই পাঠ্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করেছেন। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে হামলায় মাকে হারানো নিকোলাস হারউডের মতো ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে, যারা এই পাঠ্যক্রমকে আপত্তিকর বলে মনে করেন।
ইউনাইটেড জিউইশ টিচার্সের সভাপতি মোশে স্পার্নও সিএআইআর-এর সমালোচনা করে বলেছেন, পাঠ্যক্রমে ৯/১১ হামলাকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে যথাযথভাবে উল্লেখ না করা এবং বিন লাদেনের লেখার প্রচার চালানো অগ্রহণযোগ্য। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সদস্যরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়, যাতে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন। এই ঐতিহাসিক সত্য নিয়ে কোনো বিতর্ক না থাকলেও, হামলার পরবর্তী মার্কিন নীতি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের।
সিএআইআর-এর ২০২৬-২৭ সালের গাইড নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক কেবল একটি লিংক সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯/১১, ইসলামবিদ্বেষ, মুসলিম পরিচয়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং সন্ত্রাসবাদ কীভাবে পড়ানো হবে, সেই দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কেরই নতুন বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক বিষয়গুলো নিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরির ক্ষেত্রে জনমত ও সংবেদনশীলতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সংগঠনটি নিউইয়র্ক পোস্টকে আগের একটি নথিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে একটি নোটের দিকে নির্দেশ করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে হামলার প্রেক্ষাপট হিসেবে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ কারণেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এমন একটি পাঠ্যক্রম স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য কতটা ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সিএআইআরের বক্তব্যে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংগঠনটি বলছে, ৯/১১ নিয়ে স্কুলে আলোচনা হলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সময় হয়রানি ও বিদ্বেষের ঘটনা বাড়ে।