
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আর্জেন্টিনায় ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত এই দ্বীপপুঞ্জটি বর্তমানে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই সার্বভৌমত্বের বিরোধের সবচেয়ে উত্তপ্ত অধ্যায় ছিল ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যেখানে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন। যুদ্ধের কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও আর্জেন্টিনা কখনোই দ্বীপগুলোর ওপর তাদের মালিকানার দাবি থেকে সরে আসেনি। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে দ্বীপের ১ হাজার ৫১৭ জন ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ৫১৩ জনই ব্রিটিশ ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের পর। আগস্টের শেষ দিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, তিনি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থান পর্যালোচনার কথা ভাবছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে লুফে নিয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলোই দ্রুত নিজের দেশের দাবির পক্ষে সরব হয়েছেন। বৃহস্পতিবার এক টেলিভিশন ভাষণে মিলোই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দ্বীপগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য আর্জেন্টিনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তিনি একই সঙ্গে দক্ষিণ আটলান্টিক অঞ্চলে আর্জেন্টিনার সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
মিলোই সরকার কেবল কূটনৈতিক তৎপরতাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশেষ করে ‘সি লায়ন’ তেল প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদিও মিলোইয়ের বক্তব্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের কোনো হুমকি নেই, তবে দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব এখন আর্জেন্টিনার জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প ও মিলোইয়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ মিলোই নিজেকে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ব্রিটেন অবশ্য দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফকল্যান্ডের বাসিন্দাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং তারা ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই থাকতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, ফকল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক অবস্থানসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চয়তা দেওয়ার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৮২ সালের যুদ্ধের পর থেকে ফকল্যান্ড ইস্যুতে বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত না ঘটলেও, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং মিলোই সরকারের নতুন করে নেওয়া কঠোর অবস্থান দক্ষিণ আটলান্টিকের এই অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুনে আর্জেন্টিনার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের অবসান ঘটে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটন দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে, যদিও বাস্তবে ব্রিটিশ প্রশাসনকে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর্জেন্টিনা এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে অবৈধ বলে মনে করলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বলছে, তাদের অনুমোদন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সরকার এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই সময় মিলোইয়ের রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সাফল্যও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্বীপবাসীদের এই অবস্থানের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর আগে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতেও ব্রিটেনের অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ফকল্যান্ড ইস্যুতে মার্কিন নীতি পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।