ধর্মপুর গ্রামের মাটির গন্ধে ভোর হতো আরফ উদ্দিন প্রধানের।
তিনি ছিলেন এক আদর্শবান কৃষক, যিনি লাঙলের ফলায় মাটির বুক চিরে ফসল ফলাতেন, আর বুকে লালন করতেন এক বিশাল স্বপ্ন।
সে স্বপ্ন ছিল নিজের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। ১৯৪৮ সালের ৩১শে আগস্ট যখন সুরাতন বেগমের কোল আলো করে জন্ম নিল একমাত্র ছেলে সাহারুল ইসলাম, তখনই আরফ উদ্দিন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন-এই ছেলেকে তিনি শুধু নিজের আলোর দিশারী করবেন না, বরং পুরো গ্রামের আলো বানাবেন।
দুই বোনের ভিড়ে বড় হওয়া সাহারুল পিতা-মাতার অপরিসীম স্নেহে বড় হতে লাগলেন। তখন গাঁয়ের মেঠো পথে নারী শিক্ষার কোনো সুযোগই ছিল না।
অক্ষরজ্ঞানহীন কত শত মেয়েদের জীবন কেটে যেত কেবল হাঁড়ি-পাতিল আর চুলোর আঁচে। আরফ উদ্দিন ছেলের মাথায় হাত রেখে বলতেন, "বাবা সাহারুল, পড়ালেখা শেষ করে আমার একটাই চাওয়া-আমাদের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা বঞ্চিত মেয়েদের অন্ধকারে রাখা যাবে না। তাদের আলোয় আলোকিত করতে হবে।"
বাবার এই একটি মাত্র বাক্যই যেন সাহারুল ইসলামের জীবনের একমাত্র ব্রত হয়ে দাঁড়াল। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ বা শহরের লোভনীয় কোনো সুযোগের পেছনে দৌড়াননি।
বাবার স্বপ্নের কথা বুকে আগলে ধরে তিনি ফিরে এলেন স্বগ্রামে। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ঠিক পর পরই, ১৯৭২ সালে নিজের উদ্যোগে গোবিন্দগঞ্জের রাখালবুরুজ ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন 'ধর্মপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়'।
শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝাতে হয়েছে, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য মা-বাবাদের হাতে-পায়ে ধরতে হয়েছে। কিন্তু সাহারুল ইসলামের অদম্য ইচ্ছা আর নিষ্ঠার কাছে বাধাগুলো হার মানতে বাধ্য হলো।
একে একে গ্রামীণ কোমলমতি মেয়েরা বিদ্যালয়ে আসতে শুরু করল। যে গ্রামে একসময় নারী শিক্ষা ছিল কল্পনাতীত, সেই ধর্মপুরের মেয়েরা তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিয়ে বড় বড় জায়গায় চাকরি করতে লাগল, সুনাম কুড়াতে লাগল দেশজুড়ে।
টানা ৩৬টি বছর তিনি এই আলোর স্কুলে প্রধান কাণ্ডারি হয়ে ছিলেন। শত শত মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়ে ২০০৭ সালে তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তবে সাহারুল ইসলাম প্রধান নামের মানুষটির কাজ সেখানে শেষ হয়নি। পারিবারিক জীবনে তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। সময়ের সাথে সাথে যুগের চাহিদাকে বুঝেছিলেন তিনি।
নতুন প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করতে ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলেন 'স্কয়ার ইনস্টিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি'।
বাবার দিকনির্দেশনায় বড় ছেলে আজ সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করছেন।
ছোট ছেলেকে গড়ে দিয়েছেন 'স্কয়ার কম্পিউটার সেন্টার', যেখান থেকে গোটা এলাকার মানুষ ডিজিটাল সেবা পাচ্ছে। আর অবসরের পর নিজেকে ব্যস্ত রাখতে তিনি তৈরি করেন 'স্কয়ার টাইস কর্ণার'।
আজ সময়ের আবর্তে সেই মহান মানুষ গড়ার কারিগর বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। যে হাতে তিনি হাজারো জীবনের ভাগ্য লিখেছিলেন, যে চোখে ছিল পুরো গ্রামকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন-সেই সাহারুল ইসলাম প্রধান আজ অসুস্থ হয়ে নিজ বাসভবনে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রহর গুনছেন।
শরীর আজ নিস্তেজ, কণ্ঠ দুর্বল; কিন্তু আজও কেউ পাশে গিয়ে বসলে বৃদ্ধ শিক্ষকের ব্যাকুল প্রশ্ন থাকে একটাই-"আমার সেই ধর্মপুর বালিকা বিদ্যালয়টি কেমন চলছে? মেয়েরা ঠিকমতো পড়াশোনা করছে তো?"
জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যার হৃদয়ে স্পন্দিত হয় নারী শিক্ষার আলো, তিনি কেবল একজন মানুষ নন, তিনি একটি ইতিহাসের নাম।
চলুন, আমরা সবাই মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে এই শিক্ষানুরাগী প্রবীণ গুণীজনের আশু রোগমুক্তি ও সুস্থতার জন্য বিনম্র প্রার্থনা করি। তিনি যেন সুস্থ হয়ে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসেন।