দুর্নীতি একটি দেশের উন্নয়নকে শুধু ধীর করে না, মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও কঠিন করে তোলে। সরকারি সেবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ যখন বারবার সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে এত আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকার পরও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না কেন?
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় সাধারণ মানুষের। একজন নাগরিক তার ন্যায্য সেবা পেতে হয়রানির শিকার হলে, ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধা ছাড়া কাজ এগোয় না বলে মনে হলে কিংবা যোগ্যতার পরিবর্তে প্রভাব ও পরিচিতি গুরুত্ব পেলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ অবস্থার বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করলেই হবে না; প্রয়োজন দায়িত্বশীল নাগরিক প্রতিবাদ।
ঘুষ দেওয়া বা নেওয়াকে ‘স্বাভাবিক নিয়ম’ হিসেবে মেনে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। সরকারি সেবা গ্রহণের সময় রসিদ চাইতে হবে, অনিয়ম হলে প্রশ্ন করতে হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। প্রয়োজন হলে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমেও সরকারি কার্যক্রমের তথ্য চাওয়া যেতে পারে।
দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের বা দুর্নীতি দমন কমিশনের নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলতে হবে।
তবে প্রতিবাদ হতে হবে শান্তিপূর্ণ, তথ্যনির্ভর ও আইনসম্মত। কাউকে প্রমাণ ছাড়া দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করা নয়; বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নাগরিক প্রতিবাদের পথ।
আমাদের মনে রাখতে হবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ তখনই তৈরি হবে, যখন সমাজ অন্যায়কে আর স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে না।
ঘুষ দেব না, অন্যায় সুবিধা নেব না, অনিয়ম দেখলে নীরব থাকব না—এই অঙ্গীকার প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে তৈরি করতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়; এটি ন্যায়, সততা, স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান।
নীরবতা দুর্নীতিকে শক্তিশালী করে। তাই এখন প্রয়োজন আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও সম্মিলিত সামাজিক প্রতিবাদ। একটি সুশাসিত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
লেখক: শোয়েব হোসেন
শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক ও সমাজ গবেষক