
চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত মামলাটি নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। পরদিন তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এতে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়, তারা পরস্পর যোগসাজশে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিদেশ যাওয়ার চেষ্টাকালে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১২ আগস্ট তার জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর ২৭ আগস্ট আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। গত ৬ সেপ্টেম্বর রিমান্ড শুরু হয় এবং চার দিন জিজ্ঞাসাবাদের পর গত বুধবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানায় সিআইডি। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডন ও সালমান শাহ একসঙ্গে কাজ করেছেন। মামলার এজাহারে থাকা পলাতক আসামিদের কয়েকজনের সঙ্গে ডনের পরিচয় থাকার বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে। তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, ডন অত্যন্ত কৌশলী। তার বক্তব্যে অসংগতি পাওয়া গেছে এবং তিনি তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সালমান শাহর মৃত্যুর আগে ও পরের সময়গুলোতে ডনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে ডনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার কথা বললেও, তিনি ঠিক কী করেছেন বা তার ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে সিআইডি এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
তদন্তের এই ধীরগতি ও অস্পষ্টতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। যুক্তরাজ্য থেকে তিনি অভিযোগ করেন, রিমান্ড প্রক্রিয়াটি ছিল লোক দেখানো বা ‘আইওয়াশ’। তিনি বলেন, “রিমান্ডফেরত একজন আসামি কীভাবে হাসিমুখে হেঁটে বের হয়? মূল তথ্য বের না করে তাকে কারাগারে পাঠানো রহস্যজনক।” তিনি ডনের কাছ থেকে সত্য উদঘাটনে তাকে ও তার ভাই আলমগীর কুমকুমের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ১১ আসামির মধ্যে কেবল ডনকে গ্রেপ্তার করায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন।
তদন্তের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সিআইডির মুখপাত্র ছুফি উল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে তদন্ত চলমান থাকার কথা বলে এড়িয়ে যান। সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার গোলাম বেনজীরও এ বিষয়ে মিডিয়া বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তদন্ত সংস্থার ভাষ্যমতে, যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজন হলে ডনকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরুতে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও পরিবার শুরু থেকেই একে পরিকল্পিত ঘটনা বলে দাবি করে আসছে। এর আগে চারটি তদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও, পরিবারের রিভিশন আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চিত্রনায়ক সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিলÑতিন দশক ধরে ঘুরপাক খাওয়া সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নতুন ধোঁয়াশার সামনে দাঁড়িয়েছে মামলার তদন্ত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একদিকে আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ডনের সরাসরি সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর সংকেত ও আলামত মিলছে; অন্যদিকে সিআইডির মুখপাত্র ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে মূল ধোঁয়াশা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে বেশকিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সূত্রের বরাতে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলেও এ দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জবাব এড়িয়ে গেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাজ্য থেকে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ডন তো কোনো সাধারণ আসামি নয়, সে ৩০ বছর আগের এক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অভিযুক্ত। চাকরির আরও তথ্য: রিমান্ড শুরুর সাত দিনের আবেদন কমিয়ে পাঁচ দিন করা হলো, আবার চার দিনের মাথায় ‘অসুস্থ’ বলে তাকে আদালতে চালান দেওয়া হলো—এ যেন এক ফানি নাটক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মূল তথ্য না বের করেই তাকে ছেড়ে দেওয়া প্রমাণ করে আমাদের প্রশাসন হয় দুর্বল, না হয় অন্য কোথাও ধাবিত হচ্ছে।”। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইসঙ্গে ১১ এজাহারনামীয় আসামির মধ্যে কেবল ডনকে গ্রেপ্তার করা এবং বাকিদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।