বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার দেউলি ইউনিয়নের পাকুরিয়া মালিপাড়া গ্রামের এক কোণে নীরবে বসে আছেন শ্রী সতিস বর্মণ—বয়সে নুয়ে পড়া, মুখে দুঃখের রেখা, তবু হৃদয়ে ক্ষোভ নেই, অভিমান নেই।
এক সময় পরিশ্রমী এই মানুষটি আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন পরনির্ভরতার এক করুণ বাস্তবতায়।
তার নিজের একটি ছোট্ট ঘর আছে—ছাউনি পুরোনো হলেও থাকার মতো। কিন্তু জীবিকার কোনো পথ নেই। কর্ম করার সামর্থ্য হারিয়েছেন বহু আগেই। আজ তিনি বেঁচে আছেন মানুষের দয়া ও সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে।
মানুষের কাছে হাত পেতে কারো কাছ থেকে ৫ টাকা অথবা ১০ টাকা চেয়ে নিচ্ছেন , কখনও ১টাকা দিনশেষে সেই সামান্য টাকাতেই কেনেন খাবার ও ওষুধ।
এভাবেই চলছে তার জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি নিশ্বাস।
আমি মালিপাড়া থেকে আমার বোন জামাইয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে যখন চারমাথা বাজারের দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখনই তার দেখা পাই। বৃদ্ধ মানুষটি কাঁপা হাতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
> “বাবা, কাজ করতে পারি না… ছেলে দেখেনা, খাওয়া দেয় না, তাই মানুষের কাছে হাত পেতে যা পাই, তাই দিয়ে খাই, তাই দিয়েই ওষুধ কিনি।”
তার কথা শুনে থমকে দাঁড়ালাম। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, জীবনের ক্লান্তি সেখানে গভীরভাবে খোদাই করা। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো—তার মুখে একটুও রাগ নেই, অভিযোগ নেই।
বরং যেন এক শান্ত স্বীকারোক্তি, “এই তো জীবন—যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন কিছু না কিছু করে চলতেই হবে।”
স্থানীয়রা জানান, শ্রী সতিস বর্মণের এক সময় সংসার ছিল সুখের। ছেলেরা বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে, নিজেদের সংসার পেতেছে। কিন্তু এখন তারা কেউই বাবার খোঁজ নেয় না। কেউ জানতে চায় না বাবা খেয়েছেন কিনা, অসুস্থ কিনা, ওষুধ লাগবে কিনা।
যখন পূজা-পার্বণের মৌসুম আসে, তখনও এই বৃদ্ধের জীবন বদলায় না। বরং পূজার দিনগুলোতেও তিনি হাত পেতে ঘোরেন গ্রামের পথে—একটু সাহায্য, একটুখানি সহানুভূতির আশায়।
নিজের ধর্মের উৎসবেও তিনি উপেক্ষিত, অথচ নিজের ছেলেরা সেই একই ধর্মের আনন্দে মেতে থাকে বিলাসে, বাবার খবর নেওয়ার সময় পায় না।
এই দৃশ্য শুধু এক বৃদ্ধ পিতার কষ্টের গল্প নয়—এটি পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক বাস্তবতা।
বৃদ্ধ বয়সে মানুষ চায় না ধনসম্পদ, চায় না বিলাসবহুল জীবন—চায় শুধু একটু যত্ন, একটু ভালোবাসা, একটু আশ্রয়।
যে সন্তানদের জন্য সারাজীবন কষ্ট করেছেন, তারাই আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
এই বৃদ্ধের গল্প যেন এক আয়না—যেখানে আমরা আমাদের সমাজের নির্মম চেহারা দেখতে পাই।