বান্দরবানের লামা উপজেলায় সরকারি বনাঞ্চলের কাঠবোঝাই দুটি ট্রাক্টর ট্রলি জব্দ করার পর রহস্যজনকভাবে একটি ট্রলি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় বন বিভাগের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও কাঠ পাচারে সহযোগিতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের পক্ষে সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহে রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কে. এম. কবির উদ্দীন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে লামা সদর রেঞ্জের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেটের মধ্যে গড়ে উঠেছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত পাচার হচ্ছে মূল্যবান গাছ।
ভোরে জব্দ, রাতে রহস্যজনক মুক্তি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ভোর প্রায় ৫টার দিকে লামার লাইনঝিরি এলাকা থেকে সরকারি বনাঞ্চলের কাঠবোঝাই দুটি ট্রাক্টর ট্রলি জব্দ করেন বন বিভাগের সদস্যরা। পরে ট্রলি দুটি বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়া হয়।
কিন্তু রাত আনুমানিক ১২টার দিকে জব্দকৃত ট্রলিগুলোর মধ্যে একটি রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, ছেড়ে দেওয়া ট্রলিটি নাছির উদ্দীন মাঝির মালিকানাধীন।
স্থানীয়দের দাবি, ট্রলিটি প্রথমে নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রাখা হলেও পরে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে তা ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলি মালিক ও চালকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার পরই সেটি মুক্ত করে দেওয়া হয়।
‘লাইন’ বাণিজ্যের অভিযোগ
স্থানীয় ব্যবসায়ী রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, বন বিভাগের কিছু কর্মচারীর মাধ্যমে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তাকে টাকা না দিলে পাহাড়ি বাগান কাটার অনুমতি পাওয়া যায় না।
তার ভাষায়,
“জোত পারমিট ছাড়া বাগান কাটতে হলে বন বিভাগের কিছু লোককে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। এছাড়া কাঠবোঝাই ছোট গাড়ির জন্য ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং বড় গাড়ির জন্য এক হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে ‘লাইন’ নিতে হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ‘লাইন’ বাণিজ্যের মাধ্যমেই প্রতিদিন রাতের আঁধারে অবৈধ কাঠ পরিবহন নির্বিঘ্ন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী কাঠ পাচারকারী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবাধে কাঠ পাচার চলছে।
তিনি জানান, পোঁপা মৌজা, নাইক্ষ্যংমুখ, লামাখাল, পোপা খালের উজান, কোহ্লাখ্যা পাড়া, ইয়াংছা কাঠালছড়া, বনফুর পাড়া ও বমু রিজার্ভ এলাকার দুর্গম ঝিরিপথ ব্যবহার করে এসব কাঠ পরিবহন করা হয়।
বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি ছোট-বড় ট্রাক, জিপ, ভ্যান ও ট্রলির মাধ্যমে সেগুন, গামারী, গর্জনসহ বিভিন্ন মূল্যবান গাছ এবং জ্বালানি কাঠ পাচার হচ্ছে। এসব কাঠ পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ কাঠ পরিবহনের জন্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা আদায় করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে—
প্রতি ট্রাক কাঠ থেকে নেওয়া হয় ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, জিপগাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ টাকা, বাঁশবোঝাই ট্রাক থেকে প্রায় আড়াই হাজার টাকা, জ্বালানি কাঠবোঝাই ট্রলি থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ না করলে অবৈধ কাঠ পরিবহন সম্ভব নয়।
পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
পরিবেশবিদ জসিম আজাদ বলেন, অবাধ বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন,
“পোপা হেডম্যান পাড়া, গিলা পাড়া, খ্রিস্টান পাড়া ও কাইরম পাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বনজ সম্পদ প্রায় বিলুপ্তির পথে। পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও।”
পরিবেশবিদদের মতে, এইভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পাহাড় ধস, পানির সংকট এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
আগেও ছিল অনিয়মের অভিযোগ
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও কে. এম. কবির উদ্দীন কক্সবাজারের রামু জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে সুফল প্রকল্পের বনায়নে লাখ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছিলেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে. এম. কবির উদ্দীন।
তিনি বলেন, “ভোরে প্রথমে একটি কাঠবোঝাই গাড়ি জব্দ করা হয়। পরে একটি খালি গাড়িও আটক করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে একটি গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অন্য গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, “কাঠবোঝাই গাড়িটির পেছনে থাকা খালি গাড়িটি সম্ভবত খবর পেয়ে পথে কাঠ ফেলে চলে আসছিল। তদন্ত শেষে সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।”
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, বন বিভাগের অভ্যন্তরে দুর্নীতি ও পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ি বনাঞ্চল রক্ষা করা সম্ভব হবে না।