
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ১৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার তিব্বত থেকে নেমে আসা ভোতে কোশি নদীতে সৃষ্ট এই আকস্মিক বন্যায় রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটি, পাথর ও পানির তোড়ে বহু বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং অনেক বসতি ভেসে গেছে। এই বিপর্যয়ে কয়েকশ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশ পর্যটক। তবে নিখোঁজদের তালিকায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক আছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের তালিকায় ৩৮৪ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই) এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। এছাড়া তালিকায় ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, বৃটেন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকরাও অন্তর্ভুক্ত। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও অবস্থান যাচাইয়ের কাজ চলছে। অনেক পর্যটক কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা থেকে এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে বড় ধরনের ভূমিধস হয়ে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়েছিল, যা পরে ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ওই অঞ্চলে ভূমিকম্পের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, তিব্বতে হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে সকাল ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে ভোতে কোশি নদীতে পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
বন্যা ও ভূমিধসের ফলে নেপালের তিব্বতের সঙ্গে ২৬০ বছরের পুরোনো বাণিজ্যপথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী নদীর ওপর অন্তত অর্ধডজন সেতু ভেসে যাওয়ায় চিতওয়ান ও পোখারার মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশটির মোট জলবিদ্যুৎ সক্ষমতার ১২ শতাংশেরও বেশি।
উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে, তবে পানির প্রবল স্রোত ও দুর্গম এলাকার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। বুধবার বিকেল পর্যন্ত অন্তত ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ জানিয়েছে, রাসুয়া এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ ফেটে যাওয়া বা নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কারণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের সন্ধানে সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিয়েরং বন্দরেও এই বন্যার প্রভাব পড়েছে, যেখানে সড়ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোতে নেপাল সরকার চিকিৎসক দল ও অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তালিকায় চিহ্নিত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভারতীয়রাই সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাথমিক প্রতিবেদন ও ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের চীনা ভূখণ্ডের শাইলং থেকে রাসুয়া, নুওয়াকোটের ত্রিশূলী ও ধাদিং পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় নদীর পানি বহু বসতি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাথমিকভাবে যেখানে ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এক কর্মকর্তা বলেন, হতাহতের বিষয়ে কিছু অপ্রমাণিত খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার প্রায় ৪০০ তীর্থযাত্রীর তিব্বত-চীন সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড পর্যটক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে বলেছে, তালিকায় নাম থাকা কারও নিরাপত্তা নিয়ে যাচাই শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।