
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা যুগোপযোগী করতে সরকার জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নতুন বেতনকাঠামো এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬-এর অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গঠিত সচিব কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করে মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে এই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুননির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বেতন বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এর ফলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া সরকার প্রথমবারের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ভাতার পরিধি বাড়িয়ে সব গ্রেডের কর্মচারীদের এর আওতায় আনা হয়েছে, যা আগে কেবল পঞ্চম গ্রেডের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ (ওআরওপি) পদ্ধতি ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আওতায় ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা ৫৫ শতাংশ হারে বর্ধিত পেনশন সুবিধা পাবেন।
নতুন এই বেতনস্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে পুরো বেতনস্কেল একযোগে কার্যকর না করে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিনটি ধাপে এবং বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য গঠিত পৃথক কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেলও একইভাবে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে। এই নতুন বেতনকাঠামোর ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং সংস্থাকে এই বেতনস্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, এই পদক্ষেপ সরকারি কর্মচারীদের কর্মোদ্দীপনা বৃদ্ধির পাশাপাশি একটি দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পদ্ধতি সামরিক ও অসামরিক—সব ক্ষেত্রে একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এ মুহূর্তে ওআরওপি পদ্ধতি বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ থাকায় এবং বেসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের কোনো তথ্য না থাকায় সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ওআরওপি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে যেসব পেনশনভোগী দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাচ্ছেন, তাদের নিট পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অর্থের সংস্থান মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: সেখানে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিধান থাকবে।