
বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ। কিন্তু এই সম্পদ সংরক্ষণের পরিবর্তে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যেভাবে ধ্বংসের আয়োজন চলছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কক্সবাজার পৌরসভার উদ্যোগে সুগন্ধা সৈকতের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) বালিয়াড়ি ভরাট করে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে চার লেনের ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ ও সড়ক নির্মাণের কাজ চালানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া চলছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল।
সৈকতের বালিয়াড়ি কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি সামুদ্রিক কচ্ছপ, লাল কাঁকড়া ও উপকূলীয় উদ্ভিদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এছাড়া জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে এটি একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ। বালিয়াড়িতে ইট-কংক্রিটের সড়ক নির্মাণ এই সুরক্ষাকবচকে চিরতরে ধ্বংস করবে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, মেরিন ড্রাইভের মতো এই সড়কও সাগরের জোয়ারের তোড়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে অসাধু চক্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল হলেও কক্সবাজারের সংবেদনশীল প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
পৌরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, একটি প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় কোন যুক্তিতে অধিদপ্তর এমন ধ্বংসাত্মক কাজের অনুমোদন দিল। কক্সবাজার শহর সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের মতো জরুরি কাজ বাদ দিয়ে সৈকতের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের মধ্যে জনকল্যাণের চেয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যই বেশি স্পষ্ট। এই প্রকল্প নিয়ে ক্ষুব্ধ পরিবেশবাদী সংগঠন, নগরবিদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক, জাইকা প্রতিনিধি ও পৌর কর্মকর্তাসহ চারজনকে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে সুগন্ধা সৈকতের এই নির্মাণকাজ অবিলম্বে স্থগিত করা এবং প্রকল্পের নকশা পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো শহর জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং নালা-ড্রেন পরিষ্কারের টেকসই কোনো উদ্যোগ নেই, সেখানে নগরবাসীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসন না করে সৈকতের বুক চিরে সড়ক বানানোর মধ্যে পরিবেশপ্রেম তো দূরের কথা, জনকল্যাণে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বোপরি সমুদ্রের বিশাল ঢেউ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে বালিয়াড়ি ও সাগরলতা উপকূলীয় লোকালয়ের জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই বালিয়াড়িতে ইট-কংক্রিটের চার লেনের রাস্তা নির্মাণ করার অর্থ এই প্রতিরক্ষাব্যূহকে চিরতরে চুরমার করা।