
১৯৫৪ সালের ৩০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের সিলাকগায়া শহরে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে, যা মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে আজও বিস্ময় হয়ে আছে। সেই দুপুরে ৩১ বা ৩৪ বছর বয়সী অ্যান হজেস নিজের ঘরের সোফায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে বাড়ির ছাদ ভেদ করে মহাকাশ থেকে আসা একটি পাথর সরাসরি তার ঘরে আছড়ে পড়ে। প্রায় ৮ দশমিক ৫ পাউন্ড বা ৩ দশমিক ৮৫ কেজি ওজনের সেই উল্কাপিণ্ডটি ঘরের একটি রেডিওতে আঘাত করার পর তার নিতম্ব ও উরুর অংশে লাগে। এই ঘটনায় হজেসের শরীরে বড় ধরনের কালশিটে পড়লেও তিনি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, শুরুতে স্থানীয়দের অনেকে বিমান দুর্ঘটনা বা কোনো বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করেছিলেন। তবে দ্রুতই বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, এটি মহাকাশ থেকে আসা একটি উল্কাপিণ্ড। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন সূত্র অ্যান হজেসকে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে আহত হওয়া প্রথম নথিবদ্ধ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ঘটনার সময় একই উল্কাবৃষ্টির আরেকটি খণ্ড কাছাকাছি এলাকায় পড়েছিল, যা পরে কৃষক জুলিয়াস কে. ম্যাককিনি খুঁজে পান এবং সেটি স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের সংগ্রহে জমা দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর হজেসের জীবনে শুরু হয় নানা জটিলতা। একদিকে সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহ ও দর্শনার্থীদের ভিড়, অন্যদিকে উল্কাপিণ্ডটির মালিকানা নিয়ে আইনি লড়াই। হজেসরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়ির মালিক বার্ডি গাই দাবি করেন যে, যেহেতু পাথরটি তার বাড়ির ছাদ ভেদ করে পড়েছে, তাই সেটির মালিক তিনিই। শেষ পর্যন্ত ৫০০ ডলারের বিনিময়ে এই বিরোধের নিষ্পত্তি হয় এবং উল্কাপিণ্ডটি হজেস পরিবারের কাছেই থেকে যায়। এক পর্যায়ে তারা এটিকে দরজার ঠেকনা হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে অ্যান হজেস সেই ঐতিহাসিক উল্কাপিণ্ডটি আলাবামা মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে দান করে দেন। গবেষণায় এই পাথরটিকে ‘সিলাকগায়া’ উল্কাপিণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা কোটি কোটি বছর ধরে মহাকাশে ছিল। তবে এই ঘটনার রেশ হজেসের ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। অতিরিক্ত প্রচার এবং আইনি জটিলতা তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৬৪ সালে তার স্বামী হিউলেট হজেসের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে এবং ১৯৭২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, এনসাইক্লোপিডিয়া অব আলাবামা এবং মেটিওরিটিক্যাল সোসাইটির নথিতে এই ঘটনাটি মহাকাশ ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম অদ্ভুত ও বিরল ঘটনা হিসেবে সংরক্ষিত আছে। একটি মহাজাগতিক বস্তুর সরাসরি মানুষের শরীরে আঘাত করার ঘটনাটি আজও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। যে নারী সেদিন দুপুরে ঘরে শান্তিতে বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন, একটি মহাজাগতিক পাথর তার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার সিলাকগায়া শহরের একটি সাধারণ দুপুর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিকট শব্দে ঘর কেঁপে ওঠার পর কেউ কেউ বিমান দুর্ঘটনা বা বিস্ফোরণের কথা ভেবেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঘটনার পর অবশ্য শারীরিক আঘাতের চেয়ে অন্য এক ধরনের ঝামেলাই হজেসের জীবনে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাতারাতি তিনি সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাংবাদিক ও দর্শনার্থীরা তার বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে তার ছবি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনকি তাকে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আই হ্যাভ গট আ সিক্রেট’-এও অংশ নিতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন পছন্দ করা হজেস এই অতিরিক্ত পরিচিতি মোটেও উপভোগ করেননি।