লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (১৯৩৬-১৯৮১) ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, সেই সাথে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
পরিচিতি : জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ – ৩০ মে ১৯৮১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টার সময় নিহত হন।
জন্ম ও পারিবারিক ইতিহাস : জিয়াউর রহমান ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ সালে বগুড়া জেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনসুর রহমান তৎকালীন কলকাতায় সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন এবং অর্থনৈতিক/শিল্প-সংক্রান্ত সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি কলকাতায় কাটান। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। তাঁর পারিবারিক পরিবেশে শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও কর্মনিষ্ঠার প্রভাব ছিল বলে জীবনীকারদের বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
শিক্ষাজীবন: জিয়াউর রহমানের শিক্ষাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কলকাতায় অতিবাহিত হয়।
পরবর্তীতে তিনি করাচিতে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি D.J. College, Karachi-তে পড়াশোনা করেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত/পেশাগত প্রশিক্ষণ আসে সামরিক জীবনে।
সামরিক শিক্ষা : তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগদানের পর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সামরিক জীবনে তিনি— নেতৃত্ব, কৌশলগত পরিকল্পনা, সামরিক শৃঙ্খলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংগঠন পরিচালনা সহ নানান ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
সামরিক ও কর্মজীবন : ১৯৫০-এর দশকে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনীতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর সামরিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন সামরিক ইউনিট ও দায়িত্বে কাজ করেন।
১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী অবস্থান : ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। চট্টগ্রামে অবস্থানকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির মধ্যে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে। জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন—এটি তাঁর ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিক। পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সেক্টর কমান্ডার : তিনি মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা পালন করেন। জেড ফোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে একজন পরিচিত সামরিক কমান্ডারে পরিণত করে।
স্বাধীনতার পর সামরিক জীবন : স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে উন্নীত হন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন। ক্রমেই তিনি- সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উপ-সেনাপ্রধান, সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গভীরভাবে পরিবর্তন করে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান সে সময় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। পরবর্তী কয়েক মাসে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসেন।
পরবর্তীতে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা : জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণা ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে একটি পৃথক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় তিনি রাজনৈতিক দল সংগঠনের উদ্যোগ নেন। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা করে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন : জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনকে কয়েকটি মূল বিষয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়-
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ : তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারণা ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে— ভূখণ্ড, স্বাধীন রাষ্ট্র, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্য ইত্যাদির সমন্বিত ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
বহুদলীয় রাজনীতি : জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটে। তবে তাঁর শাসনামল একই সঙ্গে সামরিক আইন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তাই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নে গণতন্ত্রের পুনরায় রাজনৈতিক পরিসর সৃষ্টি এবং সামরিক শাসনের সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক দর্শন : জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক নীতিতে রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে অপেক্ষাকৃত বাজারমুখী ও বেসরকারি উদ্যোগনির্ভর অর্থনীতির দিকে পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। তিনি কৃষি, উৎপাদন এবং বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেন।
তাঁর অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক : কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ বিষয়ে তাঁর সরকার গুরুত্ব দেয়।
খাল খনন ও কৃষি উন্নয়ন : জিয়াউর রহমানের শাসনামলের অন্যতম আলোচিত কর্মসূচি ছিল খাল খনন কর্মসূচি। এর উদ্দেশ্য ছিল- সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন । তিনি কৃষিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন।
গ্রাম সরকার : জিয়াউর রহমান গ্রাম পর্যায়ে প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে সংগঠিত করার জন্য গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং উন্নয়ন কার্যক্রমকে গ্রাম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। তবে এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন মতামত রয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কার : জিয়াউর রহমান প্রশাসনকে অধিক কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর তাঁর সরকার জোর দেয়। তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্কৃতি বৃদ্ধির কথা বলেন।
পররাষ্ট্রনীতি : জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করা। তিনি শুধু ভারত ও সোভিয়েত ব্লকের ওপর নির্ভর না করে—মুসলিম বিশ্ব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করেন।
মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক : জিয়াউর রহমানের সময়ে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করে। বাংলাদেশ Organisation of Islamic Conference (OIC)-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি : জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। বিশেষভাবে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ান। তাঁর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও SAARC : জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকারগুলোর একটি হলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় SAARC প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে, অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। সুতরাং SAARC প্রতিষ্ঠার সময় তিনি জীবিত ছিলেন না, কিন্তু সংগঠনটির ধারণাগত উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর নাম ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।
রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন : জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল একই সঙ্গে সামরিক প্রশাসন, রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের সমন্বিত রূপ। তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—
জাতীয়তাবাদ : বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়কে সামনে আনা।
উৎপাদন : কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা।
আত্মনির্ভরতা : খাদ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর।
বেসরকারি খাত : ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
গ্রামীণ উন্নয়ন : গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক : বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করা।
গণতন্ত্র ও বিতর্ক : জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি— বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালু করেন, অর্থনীতিতে নতুন গতিশীলতা আনেন, জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত করেন, গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে— তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া সামরিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সামরিক আইন বহাল ছিল, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর বিভিন্ন সময়ে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাঁর শাসনামলে একাধিক সামরিক বিদ্রোহ ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ঘটে।
অতএব, ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে তাঁর অর্জন ও বিতর্ক—উভয় দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১৯৮১ সালের হত্যাকাণ্ড : ৩০ মে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে একদল সামরিক কর্মকর্তার অভ্যুত্থানচেষ্টার মধ্যে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন : জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁকে তিনটি পরিচয়ে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা যায়:—প্রথমত- মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা একজন সামরিক নেতা। তৃতীয়ত: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, বেসরকারি উদ্যোগ ও নতুন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করা একজন রাষ্ট্রপতি।
সংক্ষেপে
| ক্ষেত্র | জিয়াউর রহমানের ভূমিকা |
| জন্ম | ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ |
| জন্মস্থান | বাগবাড়ী, বগুড়া |
| পেশা | সামরিক কর্মকর্তা |
| মুক্তিযুদ্ধ | সেক্টর কমান্ডার/জেড ফোর্সের অধিনায়ক |
| স্বাধীনতার ঘোষণা | বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেন |
| সেনাবাহিনী | সেনাপ্রধান |
| রাষ্ট্রপতি | ১৯৭৭–১৯৮১ |
| রাজনৈতিক দল | বিএনপি প্রতিষ্ঠা |
| জাতীয়তাবাদ | বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ |
| অর্থনীতি | কৃষি, উৎপাদন ও বেসরকারি উদ্যোগ |
| স্থানীয় উন্নয়ন | গ্রাম সরকার ও খাল খনন |
| পররাষ্ট্রনীতি | মুসলিম বিশ্ব ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক |
| আঞ্চলিক সহযোগিতা | দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা |
| মৃত্যু | ৩০ মে ১৯৮১, চট্টগ্রাম |