
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই একে গণঅভ্যুত্থান বলছেন, আবার কেউ কেউ একে বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনদের বক্তব্য ও লেখনীতেও এই দুই ধারনার সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়, যা সাধারণ মানুষকে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে। ইতিহাস ও রাজনৈতিক যুক্তির নিরিখে ৫ আগস্টের ঘটনা আসলে কী ছিল, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে কী ঘটেছিল তা নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। বক্তৃতা, বিবৃতি ও লেখায় অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিরা পর্যন্ত তালগোল পাকিয়ে ফেলেন।
গণঅভ্যুত্থান বলতে সাধারণত সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও গণজোয়ারে সৃষ্ট এমন আন্দোলনকে বোঝায়, যার মূল লক্ষ্য কোনো সরকার বা শাসকের পতন ঘটানো। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, দুর্নীতি, বৈষম্য এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিক্রিয়ায় যখন জনতা রাজপথে নেমে আসে, তখনই গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা, তাৎক্ষণিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ, বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিরোধ এবং সম্মিলিত নেতৃত্ব। এছাড়া এতে নির্দিষ্ট দাবি বা ইশতেহার ও যৌথ সামাজিক পরিচিতি কাজ করে। মিশরীয় নেতা ওয়াইল ঘনিম বলেছিলেন, ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি। অন্যদিকে, অ্যাবি হফম্যানের মতে, জনগণ যখন জেগে ওঠে, তখন সরকারকে পিছু হটতে হয়। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ ধরনের গণঅভ্যুত্থানগুলো মূলত শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে জনতার ঢল ও ক্ষোভের অভাবনীয় বিস্ফোরণ ঘটে। অপরদিকে গণঅভ্যুত্থানের মূল উপাদানসমূহ হলো: যৌথ সামাজিক পরিচয় (Shared Social Identity), নির্দিষ্ট দাবি বা ইশতেহার (যেমন—বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ১১ দফা), ক্ষোভের বৈধতা, ট্রিগার পয়েন্ট বা অনুঘটক। গণঅভ্যূত্থান সম্পর্কে মিশরীয় প্রো-ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা Wael Ghonim বলেন “The power of the people is much stronger than the people in power” (অর্থাৎ “ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী”)। জনগণের ঐক্যবদ্ধতাই সরকারের পতন নিশ্চিত করে। আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতা Abbie Hoffman—এর ভাষায় “When the people stand up, the government has to sit down” (অর্থাৎ “জনগণ যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সরকারকে পিছু হটে”।
বিপ্লব হলো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও মৌলিক পরিবর্তন, যা কেবল শাসক বদলায় না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়। বিপ্লবের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক আদর্শ, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং বিপ্লবী সংগঠন ও নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। মার্কিন দার্শনিক গ্রেস লি বগসের মতে, বিপ্লব কেবল প্রতিবাদের আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি বিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। চে গুয়েভারার ভাষ্যে, বিপ্লব নিজে থেকে ঘটে না, একে সংগঠিত করে নামিয়ে আনতে হয়। ইতিহাসে বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলো হলো
উপরোক্ত ইতিহাসের আলোকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে মূলত একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। গণঅভ্যুত্থানের সব বৈশিষ্ট্য এতে উপস্থিত থাকলেও, এতে বিপ্লবের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট বিপ্লবী সংগঠন, একক নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত ছিল। জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি দ্রুত সরকার পতনের এক দফায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোতে কোনো মৌলিক বা আমূল রূপান্তর ঘটেনি। তাই তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক বিচারে ৫ আগস্টের ঘটনাকে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করা যুক্তিযুক্ত, বিপ্লব হিসেবে নয়।