
আকাশপথে যাত্রী পরিবহনের বিশ্বস্ত নাম বোয়িং। যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি তাদের ৭৩৭, ৭৭৭ ও ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো মডেলগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতে আধিপত্য বজায় রেখেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইনের বহরে এই ব্র্যান্ডের উড়োজাহাজ দীর্ঘদিনের সঙ্গী। সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক পার্শ্ব বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। নতুন এই ক্রয়াদেশের তালিকায় রয়েছে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ছয়টি ৭৩৭-৮ বিমান। চলতি বছরের আগের ১৪টি ক্রয়াদেশ মিলিয়ে বিমানের মোট বোয়িং উড়োজাহাজের অর্ডার এখন ২৫টিতে পৌঁছেছে। তুরস্ক, চীন, ভারত ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোও বর্তমানে বোয়িংয়ের নতুন বহর বাড়াতে সক্রিয় রয়েছে। তবে কোন বিমান একটি এয়ারলাইনের জন্য উপযোগী হবে, তা নির্ভর করে রুট, যাত্রীসংখ্যা, বিমানবন্দরের সুবিধা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপর।
বোয়িং মূলত যাত্রী পরিবহন, সামরিক প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও কার্গো পরিবহনের কাজে নিয়োজিত। তাদের ৭৩৭ সিরিজের উড়োজাহাজগুলো মূলত স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৭৭ সিরিজের বিমানগুলো দীর্ঘ পথের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা। ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বোয়িংয়ের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন। ২০১১ সালে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করা এই মডেলের প্রায় অর্ধেক কাঠামোর তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত কম্পোজিট উপকরণ। এর ফলে আগের প্রজন্মের বিমানের চেয়ে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম জ্বালানি খরচ হয়। এছাড়া বড় জানালা ও উন্নত কেবিন প্রেশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাত্রীদের দীর্ঘ ভ্রমণে বাড়তি আরাম দেয়। বোয়িংয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ দূরত্বে উড়ার সক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা, বেশি যাত্রী বহনের সুযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি।
নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের বিমানগুলো মাঝারি দূরত্বের রুটের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। আধুনিক ইঞ্জিন ও উইংলেটের সমন্বয়ে এই বিমানগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো আঞ্চলিক রুটে বিমান বাংলাদেশের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। তবে ৭৩৭ ম্যাক্সের নিরাপত্তা নিয়ে অতীতে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে সাময়িকভাবে এর উড়ান বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে ফ্লাইট সফটওয়্যার ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র নিয়ে পুনরায় এটি সেবায় ফিরে আসে। তবে ৭৩৭ ম্যাক্সের নিরাপত্তার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ।
বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের দামের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মডেল অনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যায়। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, একটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্সের দাম প্রায় ১২১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এছাড়া ৭৮৭-৮ মডেলের দাম ২৪৮ কোটি ৩০ লাখ, ৭৮৭-৯ মডেলের দাম ২৯২ কোটি ৫০ লাখ এবং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনারের দাম প্রায় ৩৩৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। যদিও উড়োজাহাজের চূড়ান্ত ক্রয়মূল্য মূলত বাণিজ্যিক চুক্তি, বিশেষ ছাড় এবং বিভিন্ন শর্তের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। যাত্রীবাহী সক্ষমতা এবং দীর্ঘ পথের নির্ভরযোগ্যতাকে কেন্দ্র করেই এয়ারলাইনগুলো বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।