
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে বড় ধরনের নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটেছে। মাঝ আকাশে ককপিটে সহকারী পাইলট প্রধান পাইলট স্মিত মচ্ছরকে ছুরিকাঘাত করেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখেও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন রক্ষা করায় ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরকে ‘সত্যিকারের নায়ক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে নেতানিয়াহু আহত পাইলটের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। নেতানিয়াহু বলেন, স্মিত মচ্ছরের ভূমিকার কারণে ইসরাইলি নাগরিকসহ বিমানে থাকা ১৭৪ জনের জীবন রক্ষা পেয়েছে। এদিকে সহকারী পাইলটের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, বুধবার দুবাই থেকে তেল আবিবগামী বিমানটি ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় ককপিটে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। সহকারী পাইলট প্রধান পাইলটকে আঘাত করার পর বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা চালান। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যমতে, এক মিনিটের ব্যবধানে বিমানটি প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় নেমে আসে। বিমানটিতে থাকা যাত্রীরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সাহসিকতার সঙ্গে সহকারী পাইলটকে আটকে ফেলেন। পরবর্তীতে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসেন যাত্রীরা। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা মিলে সহকারী পাইলটকে আটক করেন। ঘটনার পর বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ৩৩ হাজার ফুট বা ১০ হাজার মিটার উচ্চতায় ছিল। প্রায় এক মিনিটের মধ্যে এটি ১৭ হাজার ফুট বা ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় নেমে যায়।
ককপিটে উপস্থিত থাকা যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন জানান, তিনি টেলিভিশনে দেখা কৌশলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধরে বিমানটি ওপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া আসাফ রাজুয়ান নামের আরেক যাত্রী হামলাকারীকে দমনে সহায়তা করেন। রাজুয়ান জানান, ওই মুহূর্তে নিজের পরিবার ও সহযাত্রীদের জীবন রক্ষাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিমানটি যখন অস্থিরভাবে নিচে নামছিল, তখন যাত্রী নামা বারশাদস্কি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছিলেন এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, মনে হচ্ছিল আমরা আর বেঁচে ফিরব না। একপর্যায়ে তিনি ককপিটের দরজা খুলে দেন।
ভারতের রিয়াদ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে যে, ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে তাবুকের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে ককপিটে বিবাদ হিসেবে দেখছে এবং পুরো ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তে না পৌঁছাতে সংস্থাটি অনুরোধ জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে যে পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নিরাপত্তার খাতিরে ইসরাইলগামী প্রতিটি ফ্লাইটের পাইলটদের পরিচয় ও তথ্য কঠোরভাবে যাচাই করা হবে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতিটি ফ্লাইটের পাইলট কে, তার পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্প বলেন, হামলাকারী সহকারী পাইলট সম্ভবত মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এক ইসরাইলি প্লাম্বার ওই সময় সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে হামলাকারীকে আসন থেকে সরিয়ে বিমানটি স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে এটি তার নিজের শোনা বর্ণনা এবং এর সত্যতা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে বলে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন।
সবশেষ পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, তাবুক থেকে যাত্রীদের নিরাপদে উদ্ধার করে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের ভিডিও ফুটেজে নেতানিয়াহুকে যাত্রী হায়ুনকে আলিঙ্গন করতে দেখা যায়। ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীর পরিচয় সম্পর্কে তদন্ত সাপেক্ষে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফ্লাইদুবাই এখন ইসরাইলগামী ও ইসরাইল থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করেছে।