
তিন দশক আগে দিনাজপুর শহরের উপশহর এলাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোডে যাত্রা শুরু করে জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। অলাভজনক এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দিনাজপুর ও এর আশপাশের জেলা ছাড়িয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছেও হৃদরোগ চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ১৯৯২ সালে মরহুমা বেগম খুরশিদ জাহান হক অসংক্রামক রোগ মোকাবেলার লক্ষ্য নিয়ে এর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে মুন্সিপাড়ার একটি ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম শুরু হলেও পরে হাউজিং এস্টেটে নিজস্ব জমিতে হাসপাতালটি স্থায়ী রূপ পায়। ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি পরে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়।
হাসপাতালটির নিয়মিত রোগী বাগেরহাটের চিতলমারীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য। তিনি গাজীপুরের একটি কারখানায় কর্মরত অবস্থায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হৃদযন্ত্রে জটিলতা শনাক্ত হলে দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ পান তিনি। পরবর্তীতে পরিচিত চিকিৎসকের পরামর্শে দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি হয়ে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়া রবীন্দ্রনাথ হাসপাতালের সেবার মান ও বিশেষ আর্থিক ছাড়ের বিষয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। চিকিৎসার মান ও তুলনামূলক কম ব্যয়—এই দুই কারণে রোগীরা হাসপাতালটির ওপর আস্থা রাখছেন বলে কর্তৃপক্ষ ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। বাগেরহাটের চিতলমারীর বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ বৈদ্য (৪৫) এই হাসপাতাল থেকে হৃদরোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে তাঁর হৃদযন্ত্রের জটিলতা বাড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন, যার একটি বড় অংশই হৃদরোগী। এছাড়া জরুরি বিভাগে প্রতিদিন প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী সেবা নিতে আসেন এবং গড়ে ১৫টির বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ৩৫০টি শয্যা এবং ৩০২ জন কর্মী রয়েছেন, যার মধ্যে ১৫২ জন চিকিৎসক ও নার্স এবং ১৫০ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ২১ সদস্যের একটি অভিজ্ঞ কার্যনির্বাহী কমিটি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনকি দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকেও রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। হাসপাতালে নিয়মিত ভর্তি থাকেন শতাধিক রোগী, যাঁদের মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদরোগী।
চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়াতে হৃদরোগের বিভিন্ন অস্ত্রোপচার ছাড়াও এখানে নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, অর্থোপেডিক, ক্যানসার চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস, গাইনি ও ফিজিওথেরাপির সুবিধা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব চত্বরে গড়ে তোলা হয়েছে কেয়ার স্পেশালাইজড জেনারেল হাসপাতাল, মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতাল। স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কেয়ার নার্সিং কলেজও পরিচালনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, ইকো, ইটিটি ও সিটি স্ক্যানের সুবিধাও রয়েছে।
আর্থিক সহায়তা প্রদানেও হাসপাতালটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। জয়পুরহাটের বর্গাচাষি এমদাদুল হক গত আগস্টে বুকের ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর রিং পরানোর প্রয়োজন পড়ে। চিকিৎসা বিল পরিশোধে হিমশিম খাওয়া এমদাদুল হাসপাতালের জাকাত ফান্ড থেকে আর্থিক সহায়তা পান। ২০১০ সালে গঠিত এই তহবিলের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার অসচ্ছল রোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সামশির করিম জানান, বছরে গড়ে ২৫ লাখ টাকা এই খাতে ব্যয় হয় এবং সর্বশেষ অর্থবছরে ৩২৭ জন রোগী এখান থেকে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন।
নার্সিং শিক্ষায় অবদান রাখছে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ। এখানে বিএসসি, ডিপ্লোমা ও মিডওয়াইফারি কোর্সসহ নার্সিং সায়েন্সের বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। কলেজের সচিব শাহজাহান আলীর তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেড় হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রদীপ কুমার রায় বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে যুক্ত থাকা এক্স-রে টেকনিশিয়ান মোকাররম হোসেন জানান, স্থানীয় মানুষের ত্যাগ ও শ্রমেই হাসপাতালটি আজকের অবস্থানে এসেছে। ভবন নির্মাণের সময় অনেকেই সাধ্যমতো ইট, রড, সিমেন্ট বা কায়িক শ্রম দিয়ে সহায়তা করেছেন। বর্তমানে তাঁর দুই মেয়েও এখান থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে এখানে নার্স হিসেবে কাজ করছেন।
দীর্ঘ সময় নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ জানান, ২০০৬ সালের পর থেকে প্রায় ১৭ বছর সরকারি কোনো সহায়তা বা অনুদান থেকে প্রতিষ্ঠানটি বঞ্চিত ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ব্যক্তিগত দান ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সেবা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ পেয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে দক্ষ জনবল তৈরির অংশ হিসেবে ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ এবং কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজও চলমান রয়েছে। স্থানীয়দের সেবায় নিবেদিত এই প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয়েই বর্তমানে অলাভজনক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী, অলাভজনক ও নিজস্ব আয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান।