
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির চলমান সংঘাত এখন আর কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত, নাফ নদ এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত টেকনাফের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক কানেকটিভিটি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখন এই সংঘাতের ছায়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জুলাই ২০২৬ সালে মংডু ও বুথিডং এলাকায় ভয়াবহ বিমান হামলার পর বাংলাদেশ সীমান্তে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বাস্তব ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ায় আরাকান আর্মি এখন এই অঞ্চলে একটি প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশি জেলেদের আটক ও পরবর্তীতে বিজিবির মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের ঘটনায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট ৪৩৪ জন জেলে আটক হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২২২ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। কেবল ২০২৬ সালের আগস্ট মাসেই ২৪ জন জেলে দেশে ফিরেছেন। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে এখন দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে—একদিকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন, অন্যদিকে রাখাইনের অস্থিতিশীলতার নেতিবাচক প্রভাব থেকে সীমান্ত ও সাধারণ মানুষকে সুরক্ষিত রাখা।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাফ নদ ও উপকূলীয় অঞ্চলে জেলেদের সুরক্ষা প্রদানে নজরদারি আরও বাড়ানো অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির মতো স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গেও কার্যকর ও প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগ রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এই যোগাযোগকে কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে না দেখে, কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জরুরি বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনার মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কেবল ত্রাণনির্ভরতার বাইরে এসে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। রাখাইনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর আলোচনায় রোহিঙ্গাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বছরের পর বছর ধরে চলা শরণার্থীজীবনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাদের মধ্যে এমন নেতৃত্ব ও আলোচক গড়ে তোলা জরুরি, যারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে নিজেদের অধিকার নিয়ে যুক্তিসংগতভাবে কথা বলতে পারবে। কেবল আশ্রয় প্রদানের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে, রাখাইনে তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হবে, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশীদার করা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে টেকনাফের ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই অঞ্চল বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে। রাখাইনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই এলাকা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটিকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অতীতের কৌশলগত ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সীমান্ত, সামুদ্রিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। টেকনাফের কৌশলগত গুরুত্ব যেন সংঘাতের আড়ালে হারিয়ে না যায়, সেজন্য বাংলাদেশেকে অনমনীয় নিরাপত্তা কৌশলের পাশাপাশি দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখতে হবে। এই নিবন্ধের লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সিসিআরএসবিডি-এর নির্বাহী পরিচালক।