
দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। লাগেজ পেতে দীর্ঘ বিলম্ব, মূল্যবান মালামাল হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দরের ভেতর যানজট, অস্পষ্ট নির্দেশনা, কর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং সহায়তার অভাব প্রবাসী, বয়স্ক ও অভিবাসী কর্মীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যাত্রীরা টিকিটের মূল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ফি পরিশোধ করার বিনিময়ে দ্রুত ও সম্মানজনক সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন, যা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ফলে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা নিয়ে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশে ফেরা প্রবাসী, বয়স্ক যাত্রী, অভিবাসী কর্মী ও বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য এসব ভোগান্তি বিশেষভাবে উদ্বেগের। যানজট ও দিকনির্দেশনার সমস্যাও যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ায়।
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এয়ারলাইনস ও নিরাপত্তা সংস্থাসহ একাধিক পক্ষের সমন্বয় জরুরি। যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়লেও একে অব্যবস্থাপনার অজুহাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিমান অবতরণের পূর্বেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের প্রস্তুত রাখা এবং প্রতিটি শিফটে সেবার মান তদারকি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে লাগেজ সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার, যাতে যাত্রীরা সহজেই তাদের মালামাল বুঝে পেতে পারেন এবং কোনো সমস্যা হলে তা দ্রুত চিহ্নিত করা যায়। লাগেজ কোথায় সর্বশেষ শনাক্ত হয়েছে এবং কোন পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা নির্ধারণে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
টার্মিনালের ভেতরে যাতায়াত ব্যবস্থা ও দিকনির্দেশনা আরও স্পষ্ট করা জরুরি। প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, যানবাহন পার্কিং এবং সহায়তাকেন্দ্রগুলোর অবস্থান সহজে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বয়স্ক ও অনভিজ্ঞ যাত্রীদের সহায়তার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োজিত রাখা প্রয়োজন। একই সাথে, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত জিজ্ঞাসার কারণ যাত্রীদের স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি, যাতে তারা হয়রানির শিকার না হন। নিরাপত্তা বা ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনে প্রশ্ন করা হলেও যাত্রীকে তার কারণ পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত।
কর্মীদের পেশাদারিত্ব বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিমানবন্দরে দালালদের দৌরাত্ম্য, অননুমোদিত অর্থ আদায় ও দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু তৃতীয় টার্মিনাল চালু করলেই বিমানবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না, বরং সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। লাগেজ নিরাপদে বুঝে পাওয়া, প্রয়োজনীয় ফরম ও তথ্য সহজে পাওয়া, ট্রলি ব্যবহার এবং টার্মিনাল থেকে নির্বিঘ্নে বের হওয়ার মতো মৌলিক সেবাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
যাত্রীসেবার উন্নয়নে সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। লাগেজ সরবরাহ, অভিযোগ নিষ্পত্তি, ট্রলির প্রাপ্যতা ও নিরাপত্তা সারির মতো বিষয়গুলো নিয়মিত পরিমাপ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। প্রতিটি অভিযোগের বিপরীতে একটি ট্র্যাকিং নম্বর বা অনুসরণ নম্বর প্রদান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এর জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।