
ইউরোপের শ্রমবাজারে অভিবাসন নিয়ে বাংলাদেশিদের সামনে এখন একটি নতুন বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ উৎসদেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, অন্যদিকে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। আপাতদৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত দুটি পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে, তবে মূলত এটি ইউরোপের দ্বিমুখী অভিবাসন কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তির বৈধ প্রবাহকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাস্তবে এগুলো ইউরোপের অভিবাসননীতির দুটি ভিন্ন দিক। বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য গভীর। এমন সাধারণ বক্তব্য দিয়ে আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা আগের মতো ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশ ঘোষণা করা হয়েছে বলেই প্রত্যেক বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।
এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর। ওইদিন ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিল ইইউর প্রথম অভিন্ন নিরাপদ উৎসদেশের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে, যা ১২ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। একই দিনে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের আলোচনায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতারণা প্রতিরোধের বিষয়ও উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ইউরোপজুড়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদনের ক্ষেত্রে স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি। তবে এই হার দিয়ে প্রত্যেক আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বা অভিজ্ঞতাকে বিচার করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেনে সমকামী পরিচয়ের ভিত্তিতে মিথ্যা আশ্রয়ের আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আইনি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি; কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে যেকোনো অভিযোগ যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের অভিবাসীদের সামগ্রিকভাবে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করাও অনুচিত।
ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের এই অংশীদারত্বের প্রাথমিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে, যা ২০২৪ সালে এসে আরও গতি পায়। সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছে যে, অনিয়মিত অভিবাসন রোধে সরকার সক্রিয়। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের তথ্য তুলে ধরা হয়। সব মিলিয়ে, দক্ষ কর্মীদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করা, আশ্রয়ের প্রকৃত দাবিদারদের জন্য স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়াই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে ইউরোপে থাকার কথা ভাবছেন, তাদের বুঝতে হবে, ইউরোপের অভিবাসননীতি এখন আগের চেয়ে বেশি নিয়মকেন্দ্রিক। শুধু বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।