
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ পাওয়ার পরও ৪৫তম বিসিএস চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেটে নাম না আসায় অনেক প্রার্থী গভীর সংকটে পড়েছেন। কেন তাদের বাদ দেওয়া হলো, সেই কারণ এখনো অজানা। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এসে নিয়োগের চূড়ান্ত প্রাক্কালে এ ধরনের অভিজ্ঞতা তরুণদের জন্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার মতো। সরকারি নিয়োগের এই অস্বচ্ছতা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সামগ্রিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রশ্ন তুলছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪৫তম বিসিএসে পিএসসি মোট ১ হাজার ৮০৭ জনকে সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জন চূড়ান্ত নিয়োগ পেয়েছেন। বাদ পড়া ১০৫ জনের মধ্যে ৪৯ জন শারীরিক পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ায় তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছেন। তবে বাকি ৫৬ জনকে কেন নিয়োগ দেওয়া হলো না, সেটিই বড় প্রশ্ন। এর আগেও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ৫৭ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম প্রজ্ঞাপনে ছিল না, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
পিএসসির সুপারিশের পর তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ থাকলেও তার মানদণ্ড অবশ্যই স্পষ্ট ও সবার জন্য সমান হতে হবে। অস্পষ্ট অভিযোগ, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা যাচাইকারীর পক্ষপাতিত্ব যেন কারো ক্যারিয়ারের ভাগ্য নির্ধারণ না করে। কোনো প্রতিবেদনকে চূড়ান্ত সত্য না ধরে তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকা উচিত। বাদ পড়া ৫৬ জনের মধ্যে ৯ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের সৃষ্টি করলেও, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে বৈষম্যের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা মতাদর্শের কারণে চাকরি না পাওয়ার বিষয়টিও গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ রাজনীতি করা গণতান্ত্রিক অধিকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে আশ্বস্ত করেছেন যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। আমরা আশা করি, নিয়োগের ক্ষেত্রে এ বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাবে। প্রার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়নে পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড বা অনুমাননির্ভর তথ্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই অস্বচ্ছতার ফলে শুধু প্রার্থীরা নন, তাঁদের পরিবারও সামাজিক সম্মানহানি ও অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন। অনেক প্রার্থী বিদেশে পড়ার সুযোগ বা অন্যান্য ক্যারিয়ারের পথ ছেড়ে বিসিএসের জন্য অপেক্ষা করেছেন, এখন তাদের অঘোষিত অপরাধীর তকমা দেওয়া চরম অন্যায়।
প্রার্থীরা ইতিমধ্যে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে দেখা করে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী তাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই আশ্বাসের বাস্তবিক প্রতিফলন ঘটানো। নিরপেক্ষ পর্যালোচনার মাধ্যমে যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই, তাঁদের দ্রুত নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। অন্যদের ক্ষেত্রে কী কারণে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তা লিখিতভাবে জানিয়ে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়াই কেবল মেধাবীদের মনোবল অটুট রাখতে পারে।