
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। নির্ধারিত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা, ৩৫ হাজারের বেশি নিবন্ধিত সাধারণ ভোটার এবং দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের টানা মাসব্যাপী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শেষে প্রবাসীরা যখন ভোট প্রদানের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন, ঠিক তখনই গভীর আইনি জটিলতায় থমকে গেল পুরো নির্বাচনী কার্যক্রম। অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে ভোটের মাত্র দুই দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এক কঠোর আদেশে আগামী ২৫ অক্টোবরের অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন আয়োজনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিউইয়র্কের সিভিল প্র্যাকটিস ল অ্যান্ড রুলসের আর্টিকেল ৭৮ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধানের অধীনে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবরের নির্ধারিত নির্বাচন উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ করা, ভোট গণনা কিংবা নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন বা ঘোষণা করা যাবে না।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ বেআইনিভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং তাঁকে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে ২৩ অক্টোবর শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় অবস্থিত কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেন। বিজ্ঞ আদালত কেবল ২৫ অক্টোবরের নির্ধারিত ভোটগ্রহণই স্থগিত করেননি, বরং এর পাশাপাশি ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল বা প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত গত ২৮ আগস্টের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকেও বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান প্রশাসনকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বিরত রেখেছেন। বাদী আদালতের কাছে ২৮ আগস্টের সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বাতিল, বিতর্কিত গঠনতান্ত্রিক বিধানকে অকার্যকর ঘোষণা, তাঁকে বৈধ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা পুনর্বহাল এবং সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগে এক রাতে প্রায় ২৭ হাজার কথিত ভুয়া সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও বাদীপক্ষ উত্থাপন করেছে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে আদালতের দ্বারস্থ হন। ২৩ অক্টোবরের তিন পৃষ্ঠার ‘অর্ডার টু শো কজ উইথ টেম্পোরারি রেস্ট্রেইনিং অর্ডার’ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক চেরি এ বাগস জরুরি বিচারক হিসেবে আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। আদালত আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বিবাদীদের কাছে আদেশ ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট থেকে এ জাতীয় কড়া নির্দেশ আসার পরপরই শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। উক্ত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আদালতের সর্বশেষ নির্দেশাবলী, মামলায় উথাপিত নানাবিধ অভিযোগ এবং উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে সংগঠনের পরবর্তী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসেরসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। এই নজিরবিহীন আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানি আগামী ৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বহুল আলোচিত এ নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমান বিরোধের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটির আগের নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। আগামী ৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের পার্ট ২৩, কক্ষ ১৪০-এ পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত রয়েছে।
মামলার দাখিলকৃত মূল নথি ও প্রকাশিত বিস্তারিত আবেদনের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ওসমান এ চৌধুরী ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে সরাসরি সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চরমভাবে আগ্রহী ছিলেন। বাদীপক্ষের সুনির্দিষ্ট দাবি অনুযায়ী, সংগঠনের সমস্ত নির্ধারিত প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে মেনে আবেদনপত্র এবং নির্ধারিত ২০ ডলার ফি যথাসময়ে জমা দেওয়ার পরও গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটি সম্পূর্ণ সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর আবেদনটি বাতিল ও প্রত্যাখ্যান করে। তবে আবেদনপত্র গ্রহণ এবং এর বিপরীতে অর্থ জমা নেওয়ার প্রশাসনিক বিষয়টি ২৬১৬০৭ নম্বর মানি রসিদের মাধ্যমে সোসাইটি পূর্বেই স্বীকার করেছিল বলেও মামলার নথিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের মূল ভোটার তালিকা, সদস্যপদের আবেদনপত্র, চাঁদা পরিশোধের হিসাব ও নির্বাচনী ব্যালটসহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণের আদেশ দিয়েছেন। আদালতের নথিতে মামলার নম্বর ৭৩২১৭৪/২০২৬।
আদালতে পেশ করা মামলার নথিপত্রের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর স্বাক্ষরে পাঠানো মূল প্রত্যাখ্যানপত্রে বাংলাদেশ সোসাইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্বের চলমান আইনগত মামলা এবং সংগঠনের মূল গঠনতন্ত্রের নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারাকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ওসমান চৌধুরীর জোরালো অভিযোগ, ইতিপূর্বে সংগঠনের বিভিন্ন নির্বাচনী চরম অনিয়ম এবং অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন বলেই প্রশাসনিক রেষারেষির কারণে তাঁর সদস্যপদ এভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বাদীপক্ষ বাংলাদেশ সোসাইটির গঠনতন্ত্র ও উপবিধির নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারার বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করেছে।
বাদীপক্ষের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, সোসাইটির পাঠানো চিঠিতে সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান চিরস্থায়ী নয় বলে কৌশলে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে এর মাধ্যমে এবারের নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়ার এবং সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সম্পূর্ণ বিনষ্ট করা হয়েছে। মামলাটি কেবল সাধারণ সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এতে নির্বাচনী অধিকার হনন এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার গম্ভীর বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। তবে এসব জটিল অভিযোগ এখনো গঠনমূলকভাবে আদালতে চূড়ান্ত প্রমাণিত হয়নি। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটির গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলোর আইনি বৈধতা নিয়েও বিচারকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত রায় আসেনি। বাদীপক্ষের যুক্তি, সংশ্লিষ্ট বিধানটি নিউইয়র্কের প্রচলিত আইন ও জননীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সদস্যদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সীমিত করে।
দীর্ঘ আট বছর পর আবারও নির্বাচনের ঠিক রাজনৈতিক আগমুহূর্তে আদালতের কাছ থেকে এ ধরনের আইনি নিষেধাজ্ঞা আসায় বাংলাদেশ সোসাইটির অভ্যন্তরীণ চরম বিরোধ নিষ্পত্তি, সাধারণ প্রবাসীদের সদস্যপদের মৌলিক অধিকার এবং অবাধ নির্বাচন পরিচালনার সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন নিয়ে নিউ ইয়র্কের প্রবাসী সমাজে ব্যাপক নতুন আলোচনা ও যুক্তিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৮ সালেও ভোটার তালিকা, সদস্যপদ, নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।
আদালতের বর্তমান আদেশের রূপরেখা অনুযায়ী, পরবর্তী ধার্য শুনানিতে বিবাদীপক্ষ নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য, আইনি ব্যাখ্যা ও যুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবে। কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক গভীরভাবে পর্যালোচনার পর প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত বিষয়সমূহের ওপর চূড়ান্ত দিকনির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। এই আইনি নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে, আংশিক সংশোধিত হবে নাকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়া হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিচারকের পরবর্তী চূড়ান্ত আদেশের ওপর। ফলে ব্যালট বাক্সের বদলে প্রবাসীদের এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নির্বাচনী ভবিষ্যৎ আপাতত আদালতের এজলাস ও আইনি কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত হচ্ছে এবং সকলের দৃষ্টি এখন আগামী ৫ নভেম্বরের মহাগুরুত্বপূর্ণ শুনানির দিকে।