সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং মৃত্যু হার হ্রাসে করণীয় বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে বাংলা ভাষায় এবস্ট্রাক্টসহ সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশি একদল গবেষকের। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে ঢাকা শহরে প্রায় ৪৫ ভাগ মোটরসাইকেলচালকদের সড়ক নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান নেই।
গত ২৮ নভেম্বর ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের ইনজুরি প্রিভেনশনে প্রকাশিত ‘এক্সপ্লোরিং দ্য নলেজ অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস অন রোড সেইফটি মেজারস এমং মোটরবাইকার্স ইন ঢাকা, বাংলাদেশ : অ্যা ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শিরোনামে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মেসবাহউর রহমানের নেতৃত্বে একদল গবেষক। গবেষণাটি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোলাবোরেশানে প্রকাশিত ইস্যু- ডব্লিউএইচও গ্লোবাল স্টেটাস রিপোর্ট অন রোড সেইফটি (সাপ্লিমেন্ট) এ প্রকাশিত হয়েছে। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোড সেইফটি পলিসিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।
গবেষণার বিষয়ে জনস্বাস্থ্য গবেষক মেসবাহউর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক জার্নালে বাংলা ভাষায় গবেষণা প্রকাশ- এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। আমরা ঢাকা শহরের ৩৫০ জন মোটরসাইকেল চালকের ওপর গবেষণাটি করেছি। আমাদের গবেষণায় মোটরসাইকেল চালকদের সড়ক নিরাপত্তা বিধিসমূহ সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান রয়েছে সেটি তুলে আনার চেষ্টা করেছি। এতে দেখা গেছে, ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ চালকদের সড়ক নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান আছে। ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ চালকদের সাধারণ জ্ঞান ও ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ চালকদের যথেষ্ট কম জ্ঞান আছে।

তিনি আরও বলেন, সড়ক নিরাপত্তাবিধি যথাযথ অনুসরণ করেন কি না সে বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ চালক সঠিকভাবে অনুসরণ করেন। বাকি ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে ২৬ শতাংশ মোটামুটি অনুসরণ করেন এবং ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ চালক যথাযথ অনুসরণ করেন না। পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত এবং অধূমপায়ীদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা বিধি জ্ঞান এবং তা যথাযথ অনুসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
গবেষক মেসবাহউর রহমান বলেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে আমাদের প্রকাশিত গবেষণায় চারটি সুপারিশ উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- লাইসেন্স প্রদানের আগে চালকদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান নিশ্চিত করা এবং চালকদের জন্য বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক নিয়মকানুন বিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য ও উপাত্তসমূহের সঠিক সংরক্ষণ এবং তার পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ করে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া; সড়ক দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী রেফারেল সিস্টেম চালু করা; এবং স্কুল ও কলেজ শিক্ষা কার্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা জ্ঞান ও তার প্রবিধান বিষয় অন্তর্ভুক্তি করা।
মোহাম্মদ মেসবাহউর রহমান বাংলাদেশের জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নিপসমের বায়োস্ট্যাটিস্টিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এ ছাড়া গবেষকদলের মধ্যে রয়েছেন- গবেষণা শিক্ষার্থী সাধন কুমার দাস, তাহাজিদ তামাননূর, আরিফাতুন নেছা, আব্দুল্লাহ আল-নোমান, পিউ দে, শুভজিত কুমার কুন্ডু, নিপসম স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাফিজা সুলতানা, নিপসম জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ এন এম সামসুল ইসলাম, কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ডঃ গোলাম ছারোয়ার, থাইল্যান্ডের মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অনুষদ বাবলু কুমার ধর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচলক অধ্যাপক ডা. বায়জিদ খুরশিদ রিয়াজ প্রমুখ।
সম্পূর্ণ গবেষণার লিংক- https://injuryprevention.bmj.com/content/early/2023/11/28/ip-2023-045071.