
কথা কম, কাজ বেশি—কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এমনই এক কর্মবীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে মাদকবিরোধী অভিযান, শিক্ষা, ক্রীড়া, সরকারি উন্নয়নকাজের মান নিশ্চিত করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং অসহায় মানুষের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে রাতদিন মাঠে কাজ করেছেন। দুর্গম চরাঞ্চলসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
সম্প্রতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে অন্য জেলায় বদলি হয়ে যাচ্ছেন কাজিপুরের এই ইউএনও। তাঁর বিদায়ের খবরে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আবেগ ও আক্ষেপ। স্থানীয়দের অনেকেই তাঁকে ‘ফাটাকেষ্ট’ ইউএনও হিসেবে অভিহিত করছেন।
স্থানীয় একজন গণমাধ্যমকর্মী জানান, গত বছরের ১৯ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি চৌহালী উপজেলা থেকে কাজিপুরে যোগ দেন। নতুন ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। ভিড় এড়াতে তিনিও এক রাতে ইউএনওর সঙ্গে দেখা করতে যান।
‘প্রথম সাক্ষাতে খুব একটা আন্তরিক মনে হয়নি’—জানিয়ে ওই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, সেদিন এসিল্যান্ডের সঙ্গে দাপ্তরিক একটি বিষয় নিয়ে ইউএনও ব্যস্ত হয়ে পড়ায় তিনি ফিরে আসেন। তবে কয়েক দিন পর কাছ থেকে তাঁকে দেখে ধারণা পাল্টে যায়।
তাঁর ভাষায়, ‘তিনি আসলে কথা বলার চেয়ে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেন।’
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর কঠোরতা, নিরপেক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের তৎপরতার কারণে কাজিপুরে নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ৫৪ বছরে কাজিপুরে এমন শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন খুব কমই দেখা গেছে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন ইউএনও। অভিযানে একটি শিক্ষকের বাড়ি থেকে গাঁজার গাছ উদ্ধারের ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
শিক্ষার্থীদের মাদক, বাল্যবিবাহ ও ইভটিজিং থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা ও ক্রীড়াকে গুরুত্ব দেন তিনি। এডিপির অর্থায়নে ১০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ক্রীড়া সামগ্রী, শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ, কলম, পেন্সিল, পানির ফ্লাস্ক, ইরেজার, শার্পনার এবং প্লাস্টিকের বেঞ্চ উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিতরণ করা হয়।
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বড় জাতীয় অনুষ্ঠান ছিল মহান বিজয় দিবস। স্থানীয়রা বলছেন, অনুষ্ঠানটি আকারে ছোট হলেও ছিল গোছানো ও ব্যতিক্রমী।
অনুষ্ঠানের দর্শকসারিতে মুক্তিযোদ্ধা, গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছাত্রপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আলাদা ট্যাগ দিয়ে আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পেরেছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনায় মানসম্মত শুভেচ্ছা উপহার দেওয়ায় তাঁদের মধ্যেও সন্তুষ্টি দেখা যায়।
কাজিপুরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ—পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা। বিশেষ করে নদীর ওপার থেকে অনেকে নকল করে পাস করার আশায় পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন করে আসেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নকলমুক্ত রাখতে এবার একটি কেন্দ্রের সব কক্ষের পরিদর্শক পাশের জেলা থেকে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল ঠেকাতে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান প্রশংসিত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এর আগেও চৌহালীতে দায়িত্ব পালনকালে পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক দিনে ১০ শিক্ষককে কারাগারে পাঠানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।
উন্নয়নকাজের মান নিয়ে আপস করেননি
দুর্গম চরাঞ্চলে উন্নয়নকাজের মান ঠিক রাখা বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারদের অনিয়ম ও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনেক সময় নিম্নমানের কাজ হয়।
কাজিপুরে দায়িত্ব নেওয়ার পর এ জায়গাতেও নজর দেন ইউএনও। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টি চরাঞ্চল হলেও এসব এলাকায় একাধিকবার সরেজমিনে গিয়ে উন্নয়নকাজ পরিদর্শন করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যেও ঠিকাদারদের কাজের মান নিয়ে সতর্ক করতে দেখা গেছে। কাজের ত্রুটি সংশোধন না করলে কিংবা গুণগত মান নিশ্চিত না হলে বিল পরিশোধ করা হবে না—এমন কঠোর অবস্থান নেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, এর ফলে আগের বছরের তুলনায় এ বছর উপজেলায় উন্নয়নকাজের পরিমাণ বেড়েছে এবং বিশেষ করে চরাঞ্চলের কাজগুলোর মানও তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতেও তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে। ক্ষমতাধরদের চাপ উপেক্ষা করে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
দিনের দাপ্তরিক কাজ শেষ করেও অনেক সময় রাতে নৌ-পুলিশ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে নদীতে অভিযান চালিয়েছেন তিনি। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা বা ৫টা পর্যন্ত অবৈধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল এবং বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘটনাও স্থানীয়দের নজরে এসেছে।
এ ছাড়া দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফ ও ভিডব্লিউডি কর্মসূচির চাল অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রাতের আঁধারে জঙ্গলের মধ্যেও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেছেন তিনি।
এসব কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অনেকের বিরাগভাজনও হয়েছেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ক্রীড়ার প্রতিও তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। দায়িত্বের শেষ দিকে একটি গোছানো ও প্রাণবন্ত ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান তিনি।