
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মোকাবিলায় এবং বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপের মুখে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে। গত দুই বছরে শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুতের বড় বড় প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে, যার সিংহভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের দখলে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনসক্ষমতা ৪১৮ মেগাওয়াট হলেও, প্রকৃত সক্ষমতা ৬৬৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বড় শিল্পকারখানার পাশাপাশি ছোট স্থাপনাগুলোকেও হিসাবের আওতায় আনলে এই সক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম জানান, জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের শর্ত পূরণের জন্য তারা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। বর্তমানে তাদের ৭টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট রয়েছে। নতুন করে সিরামিকসহ আরও ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮ মেগাওয়াট চলতি বছরেই উৎপাদনে আসবে। তাদের কারখানায় সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের খরচ পড়ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব প্ল্যান্ট কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে সক্ষম। এতে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১১ জুনের বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে চলতি বছরের একই সময়ের তুলনা করলে এই ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ তাদের বিভিন্ন কারখানায় ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ২০টি কারখানায় ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং এ বছরের মধ্যে আরও ৩০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আকিজ বশির গ্রুপ তাদের জনতা জুট মিলসে ২১ মেগাওয়াট এবং হবিগঞ্জের আকিজ গ্লাসের কারখানায় ১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) বর্তমানে ৬৪ দশমিক ৮৪ মেগাওয়াট উৎপাদন করছে এবং আরও ৫০ মেগাওয়াট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের পরিচালক তানভীর মোস্তফা জানান, তারা শুধু ছাদ নয়, বরং ভবনের সম্মুখভাগ, সীমানাপ্রাচীর ও সড়ক বিভাজকেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সৃজনশীল উপায় খুঁজছেন। ওমেরা সোলার ২০২১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১০০টি শিল্পকারখানায় ১৩০-১৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও মাসুদুর রহমান বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের জীবনকাল ২০-২৫ বছর হওয়ায় এটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য সাশ্রয়ী।
রাইজিং গ্রুপের এমডি মাহমুদ হাসান খান জানান, মানিকগঞ্জে তাদের স্পিনিং মিল গ্যাস সংকটে পড়ায় ২০১৯ সালে বাধ্য হয়েই সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে তাদের ৬টি কারখানায় ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে, যা কিছু কারখানায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা মেটাচ্ছে।
সুপারস্টার রিনিউবেল এনার্জি ৯০টি শিল্পকারখানায় প্রায় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং আরও ১০টির বেশি প্রকল্পে কাজ করছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেলে ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের খরচ ৪ কোটি টাকা থেকে কমে সাড়ে ৩ কোটি টাকায় নেমে আসতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ কারখানা এখনই উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত এবং আরও ১ হাজার ৩০০ কারখানায় দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন সম্ভব।
বর্তমানে ক্ষুদ্র শিল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৭৩ পয়সা, মাঝারি চাপে ১২ টাকা ৮৫ পয়সা এবং উচ্চ চাপে ১২ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এই খরচ ১৬ টাকার কাছাকাছি পৌঁছায়। বিপরীতে সৌরবিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি খরচ ৪ থেকে ৮ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় শিল্পমালিকরা এই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম গ্রুপ, বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান গ্রুপ, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ, টিম গ্রুপ, ঊর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার এবং কর্ণফুলী শু ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন প্রযুক্তি আসায় এখন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগের চেয়ে সময় কম লাগছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার মধ্যে বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কারখানার তিন–চার ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুতের ক্ষমতা যে বাড়ছে, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরও ২৮ মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে বর্তমানে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেটি হলে তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১১৫ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জানতে চাইলে এমজিআইয়ের পরিচালক তানভীর মোস্তফা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।