দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রকাশ্যে হামলা থেকে শুরু করে মব সহিংসতা—কোনোভাবেই থামছে না এই প্রাণহানি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি প্রাণহানির নির্দেশক। মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসেই হত্যার মামলা হয়েছে ৯৩৪টি, যেখানে প্রতি মাসেই সংখ্যাটি ৩০০-এর কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল।
জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই ভয়াবহ চিত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের অবাধ বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্যের সংঘাত, মব সহিংসতা এবং পারিবারিক ও সামাজিক কোন্দলই হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির প্রধান কারণ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, মাদকের থাবা ও ব্যক্তিগত শত্রুতা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা ও মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সাথে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনতিবিলম্বে দেশব্যাপী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিরপেক্ষ অভিযান চালানো, রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধে দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, তাই নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে দ্রুত সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।