
ভারতের একদল গবেষক মানুষের পয়ঃবর্জ্য থেকে তৈরি জৈবকয়লা বা বায়োচার ব্যবহার করে এমন এক ধরনের কংক্রিট উদ্ভাবন করেছেন, যা প্রচলিত কংক্রিটের তুলনায় অধিক শক্তিশালী। মণিপাল ইউনিভার্সিটি জয়পুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রঘুভেশ তিওয়ারির নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল নির্মাণশিল্পে পরিবেশবান্ধব উপাদানের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন পথ খুঁজে বের করা।
গবেষণার অংশ হিসেবে তেলেঙ্গানা রাজ্য থেকে সংগৃহীত পয়ঃবর্জ্য প্রথমে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সেটিকে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কম অক্সিজেনের পরিবেশে উত্তপ্ত করে বায়োচারে রূপান্তর করা হয়। বায়োচার হলো কার্বনসমৃদ্ধ এক ধরনের সূক্ষ্ম পদার্থ। গবেষকরা প্রচলিত সিমেন্টের বিভিন্ন অংশের পরিবর্তে ৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ হারে এই বায়োচার মিশিয়ে কংক্রিটের নমুনা তৈরি করেন এবং সেগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০ শতাংশ বায়োচার ব্যবহার করলে কংক্রিটের গুণগত মান সবচেয়ে ভালো থাকে। ৯১ দিন পরিচর্যার পর দেখা যায়, এই মিশ্রণে প্রচলিত কংক্রিটের তুলনায় চাপ সহনশীলতা ২১ শতাংশ এবং বাঁক সহনশীলতা ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ শতাংশ বায়োচার ব্যবহার করা মিশ্রণেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে; সেখানে ৯১ দিন পর চাপ সহনশীলতা প্রায় ২০ শতাংশ এবং বাঁক সহনশীলতা ৩৬ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, বায়োচারের বিশেষ গঠন এই শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এর ভেতরে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র কংক্রিট তৈরির সময় পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে কংক্রিটকে আরও মজবুত করে তোলে। তবে ১৫ শতাংশ বায়োচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে শক্তি বৃদ্ধির এই প্রবণতা আর দেখা যায়নি। ১৫ শতাংশ বায়োচারযুক্ত মিশ্রণে ২৮ দিন পর পানি শোষণ ও ছিদ্রতার মাত্রা প্রচলিত কংক্রিটের নিয়ন্ত্রণ মিশ্রণের কাছাকাছি ছিল। এছাড়া ১০ শতাংশ বায়োচারযুক্ত মিশ্রণের ১২০ দিনের শুকানোর সময়ের সংকোচন সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্টের মিশ্রণের সমান ছিল।
গবেষণায় ভারী ধাতু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, মিশ্রণে বায়োচারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য থেকে আসা কিছু ভারী ধাতুর ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই উদ্ভাবন পরিবেশগতভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রচলিত সিমেন্ট উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয় এবং এর ফলে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। বায়োচারের ব্যবহার এই কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে নির্মাণকাজকে আরও টেকসই করতে পারে।
গবেষক দলের সদস্য হিসেবে রঘুভেশ তিওয়ারির সঙ্গে ছিলেন প্রিয়াংশা মেহরা, শাইক হুসেইন ও সঞ্চিত আনন্দ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তিটি বর্তমানে পরীক্ষাগারভিত্তিক পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তব নির্মাণকাজে বড় পরিসরে এর প্রয়োগ এবং দীর্ঘস্থায়ী কর্মক্ষমতা যাচাই করার জন্য আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষণায় ব্যবহৃত পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ করা হয় ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের ওয়ারাঙ্গালের একটি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার থেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে সেপটিক ট্যাংক ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা মানববর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বায়োচার তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে তা গুঁড়া করে ছেঁকে সূক্ষ্ম কণায় পরিণত করা হয়, যাতে কংক্রিটের সঙ্গে মেশানো যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে কংক্রিট শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় সেই পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে সিমেন্টের সঙ্গে পানির রাসায়নিক বিক্রিয়া বা জলযোজন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, যা কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ বায়োচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সিমেন্টের ক্ষারীয় পরিবেশে বায়োচার এসব ক্ষতিকর পদার্থকে আটকে রাখতে সহায়তা করতে পারে, ফলে পরিবেশে সেগুলোর বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।