
সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশের হাজার হাজার পরিণত গাছ কাটার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের হুমকি। বর্তমান সময়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে, তখন প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ কেটে ফেলার এমন সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যা অবিলম্বে বন্ধ না করলে স্থানীয় জনজীবন ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
দুই বছর আগেও এই গাছগুলো কাটার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে স্থানীয়দের প্রবল প্রতিবাদের মুখে তা থেকে কর্তৃপক্ষ সরে আসতে বাধ্য হয়। এবার সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং সড়ক সম্প্রসারণের অজুহাতে পুনরায় গাছ কাটার কাজ শুরু হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায়, দুই বছর আগে যে গাছগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা হঠাৎ কীভাবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল? বন বিভাগ সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হওয়ার দোহাই দিলেও, কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই পরিণত গাছ কেটে ফেলা যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাছ কাটার বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। এছাড়া সামাজিক বনায়নের অনেক উপকারভোগীও গাছ কাটার বিষয়ে অবগত নন বা কোনো অর্থ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, কাদের স্বার্থে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং উপকারভোগীদের প্রাপ্য নিশ্চিত না করার বিষয়টি এই কর্মকাণ্ডের নৈতিক ও প্রশাসনিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সুনামগঞ্জ একটি সংবেদনশীল হাওরাঞ্চল, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার সঙ্গে মানুষকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। এখানে হাজার হাজার পরিণত গাছ কেটে ফেলা কেবল কাঠ আহরণের বিষয় নয়, বরং এটি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের শামিল। এসব গাছ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, দূষণ রোধ ও পথচারীদের ছায়া দিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে। নতুন চারা রোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিণত গাছের ক্ষতি কখনোই পূরণ করা সম্ভব নয়।
উন্নয়নের প্রয়োজনে সড়ক সম্প্রসারণ করা যেতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে উন্নয়ন ও বৃক্ষনিধনকে একাকার করে ফেলতে হবে। বিকল্প নকশা প্রণয়ন, সড়কের এক পাশ দিয়ে সম্প্রসারণ কিংবা গাছের অবস্থান অনুযায়ী নকশা পরিবর্তনের মতো প্রযুক্তিগত ও পরিবেশবান্ধব উপায়গুলো কেন যাচাই করা হলো না? যেকোনো বড় প্রকল্পের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ও স্বচ্ছ গণশুনানি করা জরুরি, যা এখানে উপেক্ষিত হয়েছে।