
বগুড়ার নন্দীগ্রামে জমিদার শাসনামলে দান করা পীরপাল মাঠের আবাদি জমির বিরোধে পাল্টাপাল্টি মামলার পর চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। জমির জিম্মাদার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে চটেছেন গ্রামবাসীর একাংশ। তারা আদালতের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে জমিতে ধান রোপণ করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিরোধ প্রকাশ্য হওয়ার বড় ধরণের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
গত রোববার নন্দীগ্রাম উপজেলার দারিয়াপুর মৌজার পীরপাল মাঠের বিবাদমান জমিতে ধান রোপণ করে গ্রামবাসীর একাংশ। তাদের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জমির দখলদার এসএম মামুন আলম। তিনি হাটকড়ই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও দারিয়াপুর গ্রামের প্রয়াত মোজাহার আলী শেখের ছেলে। এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছে প্রতিপক্ষরা। বিষয়টি ব্যক্তিগত ও এলাকাভিত্তিক জানিয়ে পদক্ষেপ নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে শিক্ষা বিভাগ।
প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, জমিদার শাসনামলে পীরপাল নামে পরিচিত মাঠে ৪ একর ৩৬ শতক ধানী জমি দান করেছিলেন জমিদার চন্দ্র কিশোর মুন্সি। সম্পত্তি পরিচালনার জন্য জিম্মাদার নিযুক্ত হন প্রয়াত রতিবুল্লাহ শেখ। তার নামে সিএস খতিয়ান হয়। এমআর ও আরএস দুটি রেকর্ডে রতিবুল্লাহ শেখের নাতি প্রয়াত মোজাহার আলী শেখের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি প্রয়াত হায়দার আলী শেখের পুত্র। মোজাহার আলীর মৃত্যুর পর ওয়ারিশমূলে জমিগুলো দখলপ্রাপ্ত হন পুত্র মামুন আলম। জমিদার শাসনামলে জিম্মায় পাওয়া পীরপাল মাঠের জমি তারা পারিবারিক ভাবে দীর্ঘদিন চাষাবাদ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে জমির দখলদার মামুন আলমের সঙ্গে বৈঠকে বসে গ্রাম্য মোড়লরা। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। গ্রামের একাংশ একাট্টা হয়ে জমি পত্তনের টাকা দাবি করলে দুপক্ষের বাকবিতন্ডা হয়। ধান কাটাসহ জমি দখলের হুমকি দিলে আদালতের শরণাপন্ন হন জমির দখলদার মামুন। বিবাদী আমজাদ আকন্দ, জহুরুল ইসলাম বাবু, মোফাজ্জল হোসেন, জামাল উদ্দিন, আব্দুল লতিফসহ ১৩জনের নামে মামলা হয়। মে মাসে বিবাদীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। এরপর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত ১৬ জুন জমিতে হালচাল করে প্রতিপক্ষরা। এনিয়ে পুনরায় আদালতের শরণাপন্ন হলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন বিচারক। সম্প্রতি বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (নন্দীগ্রাম) আদালতে জমির দখলদারের বিরুদ্ধে হুমকি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কাউন্টার মামলা হয়। আগের বিবাদীদের পক্ষে মামলাটি দায়ের করেন সেলিম রেজা। তিনি দারিয়াপুর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে।
শিক্ষক এসএম মামুন আলম বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে, তবুও প্রতিপক্ষরা ধান লাগিয়েছে এবং হুমকি দিচ্ছে। জবরদখল চেষ্টার বিষয়ে থানার ওসিকে বারবার বলা হলেও সহযোগিতা করেননি। তিনি জানান, আমি নিষেধাজ্ঞা মামলা করার পর বিবাদীরা আদালতে গিয়ে আপত্তি জানিয়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ করে।
কাউন্টার মামলার বাদী সেলিম রেজা বলেন, গ্রামবাসী যা বলবে, সেটাই করতে হবে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্যস্ত আছেন জানিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ব্যক্তিগত বলে জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এসএম সারওয়ার জাহান। তিনি জানান, বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের না, এখানে করণীয় নেই। অফিসিয়ালি কোনো অভিযোগও আসেনি। যেহেতু তাদের ব্যক্তিগত ও এলাকার বিরোধ। আদালত থেকে নির্দেশনা এলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নন্দীগ্রাম থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, জমির দখলদার শিক্ষকের পক্ষে আদালত নোটিশ জারির আদেশ দিয়েছিল। দুপক্ষকে জানানো হলে তারা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখবে জানিয়ে লিখিত দেয়। এরপরও আদালত অবমাননা করা হলে পরবতী আদেশ পেলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রোহান সরকার জানান, কোনো অভিযোগ আসেনি, ঘটনাটি জানা নেই। এটি আদালতের বিষয়, আমার কিছুই করনীয় নেই। আদালত যেভাবে বলবে, সেভাবেই হওয়া উচিত। জমিজমা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের দায়িত্ব।