
হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক চালকবিহীন ডুবোজাহাজ বা ড্রোন জব্দ করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, তারা সমুদ্রের তলদেশে অভিযান পরিচালনাকারী মার্কিন প্রযুক্তির এই যানটি আটক করেছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটককৃত যানটি ‘ডাইভ-এলডি’ মডেলের একটি স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি এই যানটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিটার দীর্ঘ এই ড্রোনটি মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সমুদ্রের নিচে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। এটি একবার ঘাঁটি থেকে বের হওয়ার পর সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত পানির নিচে কার্যক্রম চালাতে পারে এবং প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরতায় নামার জন্য বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে।
অ্যান্ডুরিলের তথ্যমতে, ডাইভ-এলডি সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি, মাইন শনাক্ত ও অপসারণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পানির নিচের কেবল ও পাইপলাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ২০২৪ সালে মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম ডিফেন্সস্কুপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ডাইভ-এলডি ড্রোনের বাজারমূল্য প্রায় ২৫ লাখ ডলার। ফলে ইরানের হাতে এমন একটি প্রযুক্তি চলে যাওয়ার দাবি সত্য হলে তা সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির দিক থেকেও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে ইরানের এই দাবির বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ড্রোনটি কোনো সামরিক অভিযানের অংশ ছিল না, বরং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এক দিনেরও বেশি সময় আগে এটি অচল হয়ে পড়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোনটি পুরোনো মডেলের এবং এতে কোনো সংবেদনশীল তথ্য বা শ্রেণিবদ্ধ সোনার ও রাডার সরঞ্জাম ছিল না। তবে ড্রোনটি কীভাবে ইরানের হাতে পৌঁছাল বা তারা সেটি আসলেই জব্দ করেছে কি না, সে বিষয়ে পেন্টাগন সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের সিংহভাগই এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনী মানুষের ঝুঁকি কমাতে চালকবিহীন নৌযান ও ডুবোযানের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। ফলে এই প্রণালিতে মার্কিন ডুবোযান নিয়ে ইরানের দাবি কেবল একটি সরঞ্জাম আটকের ঘটনা নয়, বরং দুই দেশের চলমান উত্তেজনায় পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই উত্তেজনার প্রভাব হরমুজ প্রণালির বাইরেও অনুভূত হচ্ছে। মঙ্গলবার সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ডুবোযান আটকের ঘটনাটি দুই দেশের চলমান সামরিক সংঘাতের একটি নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ইরানের এই ‘জব্দ’ করার দাবিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেটি আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক সংঘাত ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর অন্যতম কারণ হলো, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে সমুদ্রের বিশাল এলাকায় নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব প্রযুক্তি প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বর্তমান ঘটনায় ইরান আসলে কী ধরনের ডুবোযান জব্দ করেছে এবং সেটির ভেতরের প্রযুক্তি কতটা অক্ষত রয়েছে, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জাহাজ ও তেল পরিবহনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপও হয়েছে।