
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার শিয়ালী ও তেরখাদা উপজেলার শেখপুরা এলাকার হাজারো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম ভরসা শেখপুরা – শিয়ালী খেয়াঘাট।
অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা, নৌযানের সংকট, যাত্রীসেবার অভাব ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে।
ফলে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগী, শ্রমজীবী মানুষ সহ সাধারণ যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপসা উপজেলার শিয়ালী এলাকায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও মৎস্য আড়ৎ থাকায় তেরখাদা উপজেলার বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করে আসছেন। বিশেষ করে শেখপুরা ও আশপাশের এলাকা থেকে বহু স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত এই ঘাট পাড়ি দিয়ে শিয়ালীতে পড়াশোনা করতে আসে। একইসঙ্গে দুই পাড়ের ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই ঘাটটির গুরুত্ব অপরিসীম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিয়ালীতে গড়ে ওঠা মৎস্য আড়তে শেখপুরা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ এই পথ দিয়েই আনা-নেওয়া হয়।
এছাড়া কৃষিপণ্য, নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল ও বাজারসামগ্রী পরিবহনের জন্যও এই ঘাটই দুই পাড়ের মানুষের প্রধান নির্ভরতা।
কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খেয়াঘাটে বর্তমানে রয়েছে মাত্র একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা, যা দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রীর পারাপার কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, নৌকাটি এক পাড়ে থাকলে অনেক সময় অপর পাড়ের যাত্রীদের ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এ সময় মাঝেমধ্যে মাঝিকে পাশের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এতে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
বিশেষ করে সকালে স্কুল-কলেজ ও অফিসমুখী মানুষের চাপ বেড়ে গেলে ঘাট এলাকায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশৃঙ্খলা ও হতাশার পরিবেশ।
শুধু তাই নয়, বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বৃষ্টি ও নদীর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যাত্রীদের পারাপারে ঝুঁকি তৈরি হয়।
অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীদের ভিজা কাপড়ে স্কুল-কলেজে যেতে দেখা যায়, বই-খাতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ভিজে নষ্ট হয়।
এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে, অন্যদিকে অভিভাবকদের মাঝেও উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। রোগী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও করুণ রূপ নেয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, জেলা শহর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এই খেয়া ঘাটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ঘাটটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত নৌযান সংযোজন, যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন কিংবা ব্যবস্থাপনায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘাটটি পরিচালিত হতো।
সে সময় জনপ্রতি ৫ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হতো এবং বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যাত্রীদের কাছ থেকে বেশী টাকা নেওয়ার অভিযোগও ছিল।
৫ ই আগষ্টের পর কিছুদিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বর্তমানে আবারও পুরনো অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম ফিরে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের সময় কিংবা জনসমাবেশে জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের পাশে থাকার নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে জনগণের নিত্যদিনের কষ্ট লাঘবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে মাত্র একটি নৌকা দিয়ে হাজারো মানুষের পারাপার চলতে থাকাটা শুধু অব্যবস্থাপনাই নয়, এটি সাধারণ মানুষের প্রতি চরম অবহেলার শামিল বলেও মনে করছেন অনেকে।
দুই পাড়ের ভুক্তভোগী জনগণ দ্রুত এই খেয়াঘাটে অতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌকা সংযোজন, যাত্রীসেবায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা, ঘাট পরিচালনায় অনিয়ম ও সিন্ডিকেট বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জনগণের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং শেখপুরা – শিয়ালী খেয়াঘাটকে একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও জনবান্ধব পারাপার ব্যবস্থায় রূপ দেবে।