
সাতক্ষীরার আকাশে মেঘ জমলেই এখন কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনো তীব্র রোদ, কখনো হালকা বৃষ্টি, আবার হঠাৎ কালবৈশাখীর দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা, প্রকৃতির এই অনিশ্চিত আচরণ উপকূলীয় এই জেলার কৃষকদের মনে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
বর্তমানে জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বোরো ধানের থোড় ফেটে শীষ বের হতে শুরু করেছে। বাতাসে দুলতে থাকা সবুজ ধানের ক্ষেত যেন কৃষকের স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তবে হঠাৎ বৈরী আবহাওয়ার আঘাতে সেই স্বপ্ন ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
একই অবস্থা আম বাগানগুলোতেও। গাছে গাছে ঝুলছে আমের গুটি, যা দেখে চাষিরা আশাবাদী হলেও আবহাওয়ার অস্থিরতা তাদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিলাবৃষ্টি ও পোকার আক্রমণ নিয়ে চাষিদের মধ্যে শঙ্কা বিরাজ করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গত মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় ৭৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল।
এবারের বিশেষ ইতিবাচক দিক হলো লবণসহিষ্ণু ধানের চাষ বৃদ্ধি। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে একসময় কৃষিকাজ ব্যাহত হলেও বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় চার হাজার হেক্টর বেশি।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সাতক্ষীরা কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ সাজ্জাদুর রহমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্রি-৬৭, ৯৭, ৯৯সহ ১৪টি লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাত ১২ থেকে ১৪ ডিএস পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে এবং প্রতি বিঘায় ২৬-২৭ মণ পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। এছাড়া ব্রি-১১৭ ও ১১৩ জাত দ্রুত কৃষকের হাতে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধানের পাশাপাশি সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আম চাষ। এ বছর জেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৭১ হাজার টন। অনুকূল আবহাওয়ায় ভালো মুকুল আসায় চাষিরা বড় ধরনের লাভের আশা করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার আমের মুকুল ও গুটি বেশ ভালো। আমাদের লক্ষ্য সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর ও আম্রপালি আম আবারও বিশ্ববাজারে রপ্তানি করা। তবে শেষ সময়ে আবহাওয়ার বৈরিতা ও পোকার আক্রমণ কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করছে।
জেলার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সদর উপজেলার কৃষক আনারুল ইসলাম বলেন, সরকারের সার ও কীটনাশকের ভর্তুকি আমাদের সাহস জুগিয়েছে। তবে খাল-বিল সংস্কার না হওয়ায় সেচব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও আমরা চিন্তিত।
এদিকে কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। কৃষক আলফাজ উদ্দীন, আইয়ুব আলী, আনোয়ার হোসেন, মিজানুর রহমান ও শামসুর রহমানসহ অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় বোরো ধান ও আমের বাম্পার ফলন হবে।
সবশেষে বলা যায়, প্রকৃতির বৈরিতা জয় করতে পারলে কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম সার্থক হবে, গোলাভরা ধান আর ঝুড়িভরা আমেই পূর্ণতা পাবে তাদের স্বপ্ন।