
আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা যেভাবে দ্রুতগতিতে বাড়ছে, তার বিপরীতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ স্থাপনে সিদ্ধান্তহীনতা বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে বড় ধরনের সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে না পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি বড় বাধার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার অদূরে আয়োজিত ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে। টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান এবং মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্প প্রধান মাহমুদ শাহেদ সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ চাহিদা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, দেশে বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও সুসংহত হবে। তার মতে, এতে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং বিলম্বকাল (ল্যাটেন্সি) উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। নতুন ক্যাবল চালু হলে ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় ২৬০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল ৫০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড, সেখানে ২০২৬ সালে তা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে তা ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল পেমেন্টের মতো খাতের প্রসারে এই চাহিদা আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ এবং সি-মি-উই-৫-এর ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। ভারতের ১৯টি, মালয়েশিয়ার ২৩টি, থাইল্যান্ডের ১২টি এবং ফিলিপাইনের ১৯টি সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগের তুলনায় বাংলাদেশের এই অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। ফলে একটি ক্যাবলে ত্রুটি দেখা দিলে জাতীয় ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে।
সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সি-মি-উই-৪-এর মেয়াদ ২০৩০ সালে শেষ হতে যাচ্ছে, অথচ ২০২৮ সালের মধ্যেই দেশে বড় ধরনের ব্যান্ডউইথ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই সংকট নিরসনে বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে অপরিহার্য মনে করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হয়ে দেশের মোট সক্ষমতা ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে, যা ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড, ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৬ টেরাবিটে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ এবং ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট, ২০২৮ সালে প্রায় ২৭ টেরাবিট, ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও শিল্পখাতে ডিজিটালাইজেশনের কারণে এ চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটানোর নয়; বরং ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে।