
কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ’ (বেফাক) তাদের পাঠ্যক্রমে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের সিলেবাসেই ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে আলেম, মাদরাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো নির্মম নির্যাতনের ঘটনাকে ‘শাপলা গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে বিভিন্ন সংগঠন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় শহীদ ও নিখোঁজের সংখ্যা ৬১ জন। গবেষকদের মতে, শাপলা চত্বরের সেই আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রথম গণআন্দোলন, যার চূড়ান্ত সাফল্য অর্জিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে প্রায় ১৪ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান।
দীর্ঘদিন ধরে শাপলা স্মৃতি সংসদ, সাধারণ আলেম সমাজ ও ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সসহ বিভিন্ন সংগঠন এই ইতিহাস পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। শাপলা স্মৃতি সংসদ তাদের স্মারকলিপিতে এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও প্রামাণ্য ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতি বছর মে মাসে মাদরাসাগুলোতে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের দাবি জানায়। এছাড়া সাধারণ আলেম সমাজ জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অবদান এবং শহীদ ও আহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের পক্ষ থেকে শাপলা চত্বর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস নির্ভরযোগ্য দলিল ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীবান্ধব ভাষায় উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্যাতিত আলেমদের সংগ্রাম নিয়ে পৃথক পাঠ অন্তর্ভুক্তির দাবিও জানানো হয়।
এসব দাবির প্রেক্ষিতে সম্প্রতি বেফাকের লেখক ও সম্পাদনা পরিষদ একটি বৈঠক করে। পরিষদের সদস্য মুফতি কাজী হানিফ জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষের সিলেবাসে এই ইতিহাস যুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কীভাবে এই বিষয়গুলো সিলেবাসে বিন্যস্ত করা হবে, তা নিয়ে দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ মাহদি আযহারী বলেন, এই ইতিহাস পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত না হলে তা বর্তমান প্রজন্মের আলেমদের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনবে, কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটার ঝুঁকি থাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের গবেষক মুহিম মাহফুজ বলেন, শাপলা ও জুলাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একই ইতিহাসের শুরু ও শেষ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো মাদরাসাগুলোতেও এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মূলত শাপলাই ছিল ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনের সূচনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদী সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শাপলা থেকে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বেফাকের সিলেবাসে যুক্ত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে স্মারকলিপি দেয় শাপলা স্মৃতি সংসদ, সাধারণ আলেম সমাজ ও ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সসহ নানা সংগঠন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে কোনো অপশক্তির আরোপিত বয়ানই একসময় ইতিহাসের একমাত্র বয়ান হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে শাপলা ও জুলাই নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ভবিষ্যতে মাদরাসায়ও গবেষণা হবে বলেই আমাদের আশাবাদ।