
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। গত ৭ই আগস্ট মক্কার আল-সাফা রাজপ্রাসাদে এই ঐতিহাসিক ত্রিদেশীয় সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর আদলে তৈরি এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা তিন দেশের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য হবে। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক শিল্পে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত স্বনির্ভরতা অর্জন।
চুক্তির রূপরেখা অনুযায়ী, সৌদি আরব এই জোটে আর্থিক সহায়তা ও তহবিল জোগান দেবে। তুরস্ক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্ব পালন করবে এবং পাকিস্তান সম্মুখ সমরে জনবল ও সামরিক সামর্থ্য জোগান দেবে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবের উদ্যোগে একটি সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়েছিল। তবে মক্কা চুক্তির মতো একটি গভীরতর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগদান করা বাংলাদেশের জন্য একটি ভিন্ন মাত্রার সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই চুক্তিতে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ ৫.৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। এছাড়া জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রেও দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশ ড্রোন, ইউএভি প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণে বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।
তবে এই জোটে যোগদানের ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের ঝুঁকির কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরাসরি সামরিক জোটে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে পক্ষ নেয়ার চাপ তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য চ্যালেঞ্জিং। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংঘাত যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন কাঠামো ও ইরানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের জন্য নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, কোনো দেশের এই চুক্তিতে যোগ দেয়া তাদের নিজস্ব বিষয় হলেও, ভারত এর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি থাকা কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমান্ত সহযোগিতার সমীকরণ জটিল হতে পারে। এমনকি ভারত এই জোটে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততাকে নিজস্ব কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যোগ দিলে ভারত নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারে এবং সেক্ষেত্রে দেশটি ইসরাইলের শরণাপন্ন হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। এছাড়া সমসাময়িক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগকেও ঢাকার ওপর একটি পরোক্ষ কৌশলগত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মক্কা জোটে থাকলেই যুদ্ধের বাধ্যবাধকতা নিয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অনুরূপ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির উদাহরণ টানা হয়েছে। সেই চুক্তির পরও সৌদি আরব যখন ইরানের হামলার মুখে পড়েছিল, তখন পাকিস্তানকে সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করতে দেখা যায়নি। তবুও বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত বলে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় সম্মিলিত যুদ্ধ প্রতিশ্রুতি গ্রহণ না করা, তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ না নেয়া এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি না দেয়া।
সরকারি সংস্থাগুলোর চূড়ান্ত পরামর্শ হলো, তাৎক্ষণিক সদস্যপদ গ্রহণের চেয়ে ‘অধিকতর কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ বজায় রাখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর কৌশলগত নিরাপত্তা সংলাপ শুরু করা এবং তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংলাপের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়া পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী, বাণিজ্য ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী বিশ্লেষণ কাঠামো তৈরি করার তাগিদ দেয়া হয়েছে, যাতে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিস্তারিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানও হিসাবনিকাশে নেমেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির তাৎপর্য একাধিক মাত্রায় বিশ্লেষণযোগ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাঁচ বছরের হিসাবে সৌদি আরবই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রেমিট্যান্স উৎস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন এলে এর প্রভাব পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এই সহযোগিতা স্বচ্ছ, সীমিত, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক এবং ভারতবিরোধী কোনো কাঠামোর বাইরে হওয়া প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ এতে একটি রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদেরও তাতে জড়িয়ে পড়ার একটি নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যৌথ প্রশিক্ষণ, শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ও সামরিক চিকিৎসাক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।