সৌদিতে হুথিদের বিমানবন্দর হামলা, উদ্বেগে রিয়াদ

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। গত শনিবারের হামলায় কমপক্ষে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এর পরদিন রোববারের হামলায় আরও ১ জন নিহত ও ১১ জন আহত হন। সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বড় কর্মসূচির ঠিক পরপরই এসব হামলা সংঘটিত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে রিয়াদের। শনিবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। হামলাগুলো সৌদির বড় বড় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আয়োজনের ঠিক আগে ঘটেছে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সৌদি আরবকে অব্যাহতভাবে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে আকাশে উড়ন্ত বিমানে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক এফ. গ্রেগরি গজ জানিয়েছেন, সৌদি আরবের টেকসই নিরাপত্তার জন্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অবসান ঘটানো দরকার। একই সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানকে যেন হুথিদের হামলা বন্ধে রাজি করানো যায়, সেই পথেই সৌদি এগোতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন রিয়াদের প্রস্তাব কতটা বিবেচনা করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। তবে ট্রাম্প সৌদি আরবের কথা কতটা শুনবেন, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক জানান, সৌদি সরকার সম্ভবত আলোচনার টেবিলে বসার আগে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হুথিদের শক্তি খর্ব করার কৌশল নেবে। সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর রিয়াদে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা বজায় থাকা অবস্থায় সৌদি সরকার তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় সম্মত হবে না।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র প্রমোট করে সতর্কবার্তা জারি করে বলেছেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো তাদের অপারেশনের আওতাভুক্ত এলাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও সাধারণ যাত্রীদের সৌদি বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলনের মতো মেগা অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতে যাওয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বিশিষ্ট অতিথিদের নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষক গজের মতে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইয়েমেনের রাজধানী সানা অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা হলে সৌদি আরবের অবকাঠামোগত ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

উল্লেখ্য, এক দশক আগে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক জোটের বিমান হামলা সেখানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে, যাতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৮ সালে একটি স্কুলবাসে রিয়াদের বিমান হামলায় ৪ ৪ শিশুসহ ৫ ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানো হলে হুথিরা সৌদি আরবকেই দায়ী করে। তবে ইয়েমেনের অনুগত সরকার ওই হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, অননুমোদিত ইরানি বিমান অবতরণ ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সৌদি সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ইয়েমেন সরকার রিয়াদের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০১৮ সালে সৌদি যুদ্ধবিমান একটি স্কুলবাসে হামলা চালালে ৪৪ শিশু ও ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হন।

সানার ঘটনার পর হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পাল্টা অবরোধের ডাক দেয়। এরপর ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর নতুন সামরিক তৎপরতা ও সৌদি বোমারু বিমানের হানায় গৃহযুদ্ধ আবার মারাত্মক রূপ নেয়। বর্তমানে লোহিত সাগর রিয়াদের জ্বালানি রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ইরান ইস্যুতে প্রণালিটি প্রায়ই ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সামরিক অস্থিরতার মধ্যেও রিয়াদে নির্ধারিত জ্বালানি সম্মেলন যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিদেশি কূটনীতিকদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য আগাম সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল। সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করলেও অতিথিদের নিরাপত্তার পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের কর্মকর্তা বব ম্যাকন্যালি জানান, তারা বিমানবন্দর ছাড়ার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে পরবর্তী হামলার ঘটনাটি ঘটে। এ ছাড়া জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রধান বব ম্যাকন্যালি জানান, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর সেখানে হামলা হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিডনির নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম যাত্রীবাহী ফ্লাইটের যাত্রা শুরু

Verified by MonsterInsights

সৌদিতে হুথিদের বিমানবন্দর হামলা, উদ্বেগে রিয়াদ

আপলোডের সময় : 11:49:28 am, Monday, 12 October 2026

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। গত শনিবারের হামলায় কমপক্ষে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এর পরদিন রোববারের হামলায় আরও ১ জন নিহত ও ১১ জন আহত হন। সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বড় কর্মসূচির ঠিক পরপরই এসব হামলা সংঘটিত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে রিয়াদের। শনিবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। হামলাগুলো সৌদির বড় বড় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আয়োজনের ঠিক আগে ঘটেছে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সৌদি আরবকে অব্যাহতভাবে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে আকাশে উড়ন্ত বিমানে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক এফ. গ্রেগরি গজ জানিয়েছেন, সৌদি আরবের টেকসই নিরাপত্তার জন্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অবসান ঘটানো দরকার। একই সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানকে যেন হুথিদের হামলা বন্ধে রাজি করানো যায়, সেই পথেই সৌদি এগোতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন রিয়াদের প্রস্তাব কতটা বিবেচনা করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তাও দিচ্ছে। তবে ট্রাম্প সৌদি আরবের কথা কতটা শুনবেন, তা স্পষ্ট নয়।

এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইয়াসমিন ফারুক জানান, সৌদি সরকার সম্ভবত আলোচনার টেবিলে বসার আগে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হুথিদের শক্তি খর্ব করার কৌশল নেবে। সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর রিয়াদে হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা বজায় থাকা অবস্থায় সৌদি সরকার তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় সম্মত হবে না।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র প্রমোট করে সতর্কবার্তা জারি করে বলেছেন, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো তাদের অপারেশনের আওতাভুক্ত এলাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও সাধারণ যাত্রীদের সৌদি বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলনের মতো মেগা অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নিতে যাওয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও বিশিষ্ট অতিথিদের নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষক গজের মতে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধে ইয়েমেনের রাজধানী সানা অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা হলে সৌদি আরবের অবকাঠামোগত ক্ষতি ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

উল্লেখ্য, এক দশক আগে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক জোটের বিমান হামলা সেখানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে, যাতে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৮ সালে একটি স্কুলবাসে রিয়াদের বিমান হামলায় ৪ ৪ শিশুসহ ৫ ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানো হলে হুথিরা সৌদি আরবকেই দায়ী করে। তবে ইয়েমেনের অনুগত সরকার ওই হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, অননুমোদিত ইরানি বিমান অবতরণ ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সৌদি সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ইয়েমেন সরকার রিয়াদের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়া এই সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০১৮ সালে সৌদি যুদ্ধবিমান একটি স্কুলবাসে হামলা চালালে ৪৪ শিশু ও ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নিহত হন।

সানার ঘটনার পর হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পাল্টা অবরোধের ডাক দেয়। এরপর ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর নতুন সামরিক তৎপরতা ও সৌদি বোমারু বিমানের হানায় গৃহযুদ্ধ আবার মারাত্মক রূপ নেয়। বর্তমানে লোহিত সাগর রিয়াদের জ্বালানি রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ ইরান ইস্যুতে প্রণালিটি প্রায়ই ঝুঁকিতে পড়ছে। এই সামরিক অস্থিরতার মধ্যেও রিয়াদে নির্ধারিত জ্বালানি সম্মেলন যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিদেশি কূটনীতিকদের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য আগাম সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল। সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী এই পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করলেও অতিথিদের নিরাপত্তার পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের কর্মকর্তা বব ম্যাকন্যালি জানান, তারা বিমানবন্দর ছাড়ার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই সেখানে পরবর্তী হামলার ঘটনাটি ঘটে। এ ছাড়া জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রধান বব ম্যাকন্যালি জানান, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর সেখানে হামলা হয়।