অতিরিক্ত চুল পড়ার নেপথ্যে থাইরয়েডের প্রভাব ও প্রতিকার

চুল পড়ার সমস্যায় ভুক্তভোগীরা সাধারণত শ্যাম্পু, তেল বা বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু অনেক সময় বাহ্যিক যত্নের চেয়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোনজনিত জটিলতা চুল পড়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চুল পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। গলার সামনের দিকে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থিটি টি-৩ ও টি-৪ হরমোন নিঃসরণ করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং শারীরবৃত্তীয় নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। চুলের ফলিকল বা গোড়া সরাসরি এই হরমোনের প্রভাবে থাকে, তাই হরমোনের মাত্রায় তারতম্য ঘটলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার চক্র বাধাগ্রস্ত হয়।

থাইরয়েডজনিত চুল পড়ার ধরন

থাইরয়েড সমস্যার কারণে চুল পড়ার ধরন সাধারণ চুল পড়ার চেয়ে কিছুটা আলাদা। এক্ষেত্রে মাথার নির্দিষ্ট কোনো স্থানে টাক পড়ার পরিবর্তে পুরো মাথার চুল ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যেতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ বলা হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে চুল শুষ্ক, রুক্ষ এবং ভঙ্গুর হয়ে যায়, অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণেও চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে শুধু চুল পড়লেই যে থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পুষ্টির অভাব, আয়রনের ঘাটতি, মানসিক চাপ, বংশগত কারণ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর পেছনে দায়ী হতে পারে।

উপসর্গ ও শনাক্তকরণ

  • অস্বাভাবিক হারে চুল পড়ার পাশাপাশি ক্লান্তি অনুভব করা।
  • শরীরের ওজনে দ্রুত পরিবর্তন আসা।
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা।
  • ত্বক অস্বাভাবিক শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য বা বুক ধড়ফড় করার মতো সমস্যা।
  • নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম।

দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক চুল পড়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সাধারণত চিকিৎসক রোগীর শারীরিক অবস্থা ও উপসর্গ যাচাই করে টিএসএইচ (TSH) এবং ফ্রি টি-৪ (Free T-4) পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রয়োজনে আয়রনের ঘাটতি বা অন্যান্য পুষ্টিগত সমস্যা আছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, চুল পড়ার কারণ নিশ্চিত না হয়ে নিজে থেকে থাইরয়েডের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

চিকিৎসা ও প্রত্যাশা

থাইরয়েডের সমস্যার কারণে চুল পড়লে মূল রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনা চিকিৎসার প্রথম ধাপ। হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এলে চুল পড়া কমে আসে এবং পুনরায় নতুন চুল গজাতে শুরু করে। তবে এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। থাইরয়েডের মাত্রা ঠিক হওয়ার পরপরই মাথায় ঘন চুল দেখা যাবে এমনটা ভাবা ভুল; দৃশ্যমান পরিবর্তনের জন্য সাধারণত কয়েক মাস সময় প্রয়োজন হয়। তাই চুল পড়াকে কেবল সৌন্দর্যের সমস্যা হিসেবে না দেখে শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। হঠাৎ বা দীর্ঘমেয়াদী চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি বা ওজনের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সুস্থ চুলের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস ও অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

লেখক: রাইসা মেহজাবীন, বিএসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এমপিএইচ (ইন প্রগ্রেস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; পিজিটি অন নিউট্রিশন অ্যান্ড ফিটনেস ট্রেনিং; চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চুলের যত্নে শ্যাম্পু, তেল, সিরাম কিংবা নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করেন অনেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষণায় হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম দুই অবস্থার সঙ্গেই ব্যাপকভাবে চুল ঝরে পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সবার ক্ষেত্রে একই উপসর্গ থাকবে এমন নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

অতিরিক্ত চুল পড়ার নেপথ্যে থাইরয়েডের প্রভাব ও প্রতিকার

আপলোডের সময় : 10:09:10 am, Saturday, 29 August 2026

চুল পড়ার সমস্যায় ভুক্তভোগীরা সাধারণত শ্যাম্পু, তেল বা বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু অনেক সময় বাহ্যিক যত্নের চেয়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ হরমোনজনিত জটিলতা চুল পড়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চুল পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। গলার সামনের দিকে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র গ্রন্থিটি টি-৩ ও টি-৪ হরমোন নিঃসরণ করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং শারীরবৃত্তীয় নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। চুলের ফলিকল বা গোড়া সরাসরি এই হরমোনের প্রভাবে থাকে, তাই হরমোনের মাত্রায় তারতম্য ঘটলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার চক্র বাধাগ্রস্ত হয়।

থাইরয়েডজনিত চুল পড়ার ধরন

থাইরয়েড সমস্যার কারণে চুল পড়ার ধরন সাধারণ চুল পড়ার চেয়ে কিছুটা আলাদা। এক্ষেত্রে মাথার নির্দিষ্ট কোনো স্থানে টাক পড়ার পরিবর্তে পুরো মাথার চুল ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে যেতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ বলা হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে চুল শুষ্ক, রুক্ষ এবং ভঙ্গুর হয়ে যায়, অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণেও চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তবে শুধু চুল পড়লেই যে থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। পুষ্টির অভাব, আয়রনের ঘাটতি, মানসিক চাপ, বংশগত কারণ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর পেছনে দায়ী হতে পারে।

উপসর্গ ও শনাক্তকরণ

  • অস্বাভাবিক হারে চুল পড়ার পাশাপাশি ক্লান্তি অনুভব করা।
  • শরীরের ওজনে দ্রুত পরিবর্তন আসা।
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে না পারা।
  • ত্বক অস্বাভাবিক শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য বা বুক ধড়ফড় করার মতো সমস্যা।
  • নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম।

দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক চুল পড়ার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সাধারণত চিকিৎসক রোগীর শারীরিক অবস্থা ও উপসর্গ যাচাই করে টিএসএইচ (TSH) এবং ফ্রি টি-৪ (Free T-4) পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। প্রয়োজনে আয়রনের ঘাটতি বা অন্যান্য পুষ্টিগত সমস্যা আছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, চুল পড়ার কারণ নিশ্চিত না হয়ে নিজে থেকে থাইরয়েডের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

চিকিৎসা ও প্রত্যাশা

থাইরয়েডের সমস্যার কারণে চুল পড়লে মূল রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনা চিকিৎসার প্রথম ধাপ। হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এলে চুল পড়া কমে আসে এবং পুনরায় নতুন চুল গজাতে শুরু করে। তবে এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। থাইরয়েডের মাত্রা ঠিক হওয়ার পরপরই মাথায় ঘন চুল দেখা যাবে এমনটা ভাবা ভুল; দৃশ্যমান পরিবর্তনের জন্য সাধারণত কয়েক মাস সময় প্রয়োজন হয়। তাই চুল পড়াকে কেবল সৌন্দর্যের সমস্যা হিসেবে না দেখে শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। হঠাৎ বা দীর্ঘমেয়াদী চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি বা ওজনের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সুস্থ চুলের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস ও অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যের ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

লেখক: রাইসা মেহজাবীন, বিএসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এমপিএইচ (ইন প্রগ্রেস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; পিজিটি অন নিউট্রিশন অ্যান্ড ফিটনেস ট্রেনিং; চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চুলের যত্নে শ্যাম্পু, তেল, সিরাম কিংবা নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করেন অনেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গবেষণায় হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম দুই অবস্থার সঙ্গেই ব্যাপকভাবে চুল ঝরে পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে সবার ক্ষেত্রে একই উপসর্গ থাকবে এমন নয়।