
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা উদ্ধারের একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এই বিপুল অর্থের সন্ধান পেলেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। লন্ডনের ইউবিএস এজি ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা থাকা এই অর্থ চার সপ্তাহের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারী নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনস্ত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সময়মতো সঠিক ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার কারণেই এই অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিএ বাংলাদেশকে এই অর্থের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে। হিসাবটি ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর। সে সময় ঢাকায় তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছিল।
যুক্তরাজ্যের সংস্থাটি জানতে চেয়েছিল, এই অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশে কোনো অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং তার বিরুদ্ধে কোনো সম্পদ জব্দ বা ক্রোক করা হয়েছে কি না। তবে বিএফআইইউ সেই সময় প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি ও প্রামাণ্য তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। এর ফলে অর্থ আটকে রাখার আইনি প্রক্রিয়া থমকে যায় এবং সেই সুযোগে অর্থ পাচারকারীরা তা দুবাইয়ে স্থানান্তর করে।
শওকত আলীর বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুলাই মাসে তদন্ত শুরু করেছিল। সে সময় তার ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, সিআইডি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পৃথকভাবে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে এনসিএ যখন জরুরিভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চায়, তখনও এসব তদন্ত কেবল অনুসন্ধান পর্যায়েই ছিল।
গত ১৯শে ফেব্রুয়ারির এক বার্তায় এনসিএ সতর্ক করে জানায় যে, যুক্তরাজ্যে অর্থ আটকে রাখার প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি। ২২শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী তাদের কাছে একজন ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’ এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক সংস্থার তদন্ত চলছে। তবে এই জবাবের মধ্যে বিদেশে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের মতো জোরালো তথ্য ছিল না।
২৫শে ফেব্রুয়ারির দেওয়া আরেক তথ্যে বিএফআইইউ জানায়, শওকত আলী বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। সেই সঙ্গে এনবিআর, সিআইডি এবং দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের নামও উল্লেখ করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে যে ধরনের সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ প্রয়োজন ছিল, তা তখন পর্যন্ত অনুমোদিত না হওয়ায় তথ্য আদান-প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
এনসিএ’র আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র ২৭শে ফেব্রুয়ারি জানায়, তারা এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের আইনি ভিত্তি তখনো প্রস্তুত ছিল না। যদিও মার্চ মাসে বিএফআইইউ এনসিএকে জানায় যে, শওকত আলীর বিদেশে বিনিয়োগ বা অর্থ পাঠানোর কোনো অনুমোদন ছিল না, তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএফআইইউ’র আইনি প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সংস্থাটি মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়টি তুলে ধরেছিল, কিন্তু যুক্তরাজ্যে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের বিধিনিষেধ অনেক আগেই বিলুপ্ত হওয়ায় এই যুক্তিটি কার্যকর হয়নি। ফলে ২৫ মিলিয়ন ডলার লন্ডনে চার সপ্তাহ আটকে থাকার পর আইনি ভিত্তির অভাবে কর্তৃপক্ষ তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। এই প্রেক্ষাপটে অর্থ উদ্ধারে কার্যকর গতিপথ শনাক্তকরণ ও আইনি সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল। বর্তমানে সরকার বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্থাটির সঙ্গে এনসিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর সেই সুযোগেই বিপুল পরিমাণ অর্থ লন্ডন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরিয়ে নেয়ার সুযোগ পান শওকত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুসন্ধানে তার দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যবসায়িক লেনদেন, কর নথি এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এনবিআর, সিআইডি ও দুদক নিজ নিজ অভিযোগ তদন্ত করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এনবিআর’র তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডি’র পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই জবাবে বিএফআইইউ জানায়, ২০২৫ সালের ১লা জুলাই থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত শওকত আলীর হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনকি দেশে সম্পদ ক্রোকের মতো দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপও ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের আরেকটি জটিলতার কথাও জানায় এনসিএ।
প্রতিনিধির নাম 

























