
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই উন্নয়নের দৌড়ে এখন সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। উভয় দেশই এই প্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বা পরাশক্তি হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন এবং এআই প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্পের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এতটা সরাসরি কথা না বললেও, বেইজিংয়ের সামগ্রিক কৌশল ও দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত পরিকল্পনায় এআইয়ের অবস্থান খুবই কেন্দ্রীয়। মারকাটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের গবেষক রেবেকা আরচেসাতি জানান, চীন এআইকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে।
এআই প্রতিযোগিতার এই উত্তপ্ত আবহে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। বিশ্ব ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখন এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, এমনকি বিচারিক প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহারের বিতর্কও তুঙ্গে। তাই দুই নেতার এই বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এআই সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও এর ব্যবস্থাপনা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ‘হুমকির ধরন’ ও সংঘাত এআই ব্যবস্থাপনার পথে অন্তরায়। তারা বরং সবার কল্যাণে সহযোগিতার বার্তা দিয়েছে। তাদের দাবি, চীনের এআই উন্নয়ন ‘ব্যাপক পরামর্শ এবং অভিন্ন কল্যাণের জন্য যৌথ অবদান’-এর লক্ষ্য নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিচারে বর্তমানে ‘ফ্রন্টিয়ার মডেল’ বা উদ্ভাবনী মডেল তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এগিয়ে। অ্যানথ্রপিক, গুগল ও ওপেনএআইয়ের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ মডেলটি নিকটতম প্রতিযোগীর চেয়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ডিপসিকের একটি মডেল মার্কিন শীর্ষ মডেলের সমকক্ষ হয়েছিল, যা বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রমাণ। উন্নত মাইক্রোচিপের ওপর মার্কিন সরকারের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও চীনের এআই নির্মাতারা উদ্ভাবনী পথে পিছিয়ে নেই।
এশিয়ানি সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক লিজি লি মনে করেন, চীনের মূল লক্ষ্য হলো দেশটির বিশাল অর্থনীতিজুড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিলেও চীন সক্ষম এআইকে সস্তা ও উন্মুক্ত করে তোলার মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল নিয়েছে। এক্ষেত্রে চীন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে কারণ তাদের এআই কোম্পানিগুলো কম খরচে বিদ্যুৎ সুবিধা পায়। রোবোটিকসের ক্ষেত্রেও বেইজিং অনেকটা এগিয়ে; ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের মতে, চীনের কারখানাগুলোতে বর্তমানে ২০ লাখের বেশি রোবট কাজ করছে। চ্যাথাম হাউসের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহের ৯০ শতাংশের বেশি চীন থেকে এসেছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এআই কৌশল ও দর্শনে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নিজস্ব মালিকানাধীন মডেল তৈরিতে গুরুত্ব দেয়, যা সাবস্ক্রিপশন বা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য। বিপরীতে চীন ‘ওপেন-ওয়েট মডেল’ প্রকাশের দিকে বেশি মনোযোগী। মুনশট এআইয়ের কিমি কে৩-এর মতো মডেলগুলো ফ্রন্টিয়ার মডেলের কাছাকাছি সক্ষমতা নিয়েও বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। মার্কিন কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, চীনা নির্মাতারা ‘ডিস্টিলেশন’ নামের কৌশল ব্যবহার করে উন্নত প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য চুরি করে ব্যবধান কমাচ্ছে। তবে চীন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিরাপত্তা ইস্যুতেও দেশ দুটির দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বের কিছু বিশেষজ্ঞ এআইকে মানবজাতির অস্তিত্বের হুমকি মনে করছেন, সেখানে চীনা গবেষকদের উদ্বেগ মূলত এআইয়ের অপব্যবহার ও সাইবার যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত নিয়মকানুন রয়েছে এবং তিনি উচ্চ আইকিউসম্পন্ন নেতৃত্বকে এর চেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে এবং তারা কোনোভাবেই এই প্রযুক্তির বিকাশকে দমিয়ে রাখবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ বিষয়ে অনলাইন বিবিসিতে সাইবার প্রতিনিধি জো টাইডি এবং বিজনেস রিপোর্টার ওসমন্ড চিয়া একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদি এই প্রশ্ন করা হয়, তাহলে দুই বিষয়েই বেশ স্পষ্ট উত্তর হতে পারে চীন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে মনে হচ্ছে, তিনিও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা নিজেদের ক্ষমতা সর্বাধিক বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে এআইকে দেখে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুধু কথাবার্তার বাইরে তাকালেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শি প্রকাশ্যে বিষয়টি যতটা গুরুত্ব দিয়েই বলুন বা না বলুন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম ভিত্তি হয়ে আছে এআই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি এসব ঝুঁকিকে ‘প্রতারণা’ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে পুরো বিশ্বেই।
প্রতিনিধির নাম 

























