গোপালগঞ্জের অতিকায় আমগাছ: এক গাছেই যেন সবুজ পাহাড়

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের হিরণ্যকান্দি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর আমগাছ। দূর থেকে দেখলে এটিকে একটি সাধারণ গাছ মনে হলেও কাছে গেলে ভুল ভাঙে। এর বিশাল ডালপালা, মাটির কাছাকাছি নেমে আসা কাণ্ড এবং ঘন পাতার আচ্ছাদন দেখে মনে হয়, এটি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি কোনো সবুজ পাহাড় বা স্থাপত্য। স্থানীয়রা একে ‘শতবর্ষী আমগাছ’ হিসেবেই চেনেন।

গাছটির সুনির্দিষ্ট বয়স নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই, তবে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে বিশাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের অনেক প্রবীণ বাসিন্দার ধারণা, গাছটির বয়স একশ থেকে দুইশ বছরের মধ্যে। হিরণ্যকান্দির একজন প্রবীণ নারী জানান, পাঁচ দশকেরও বেশি আগে বিয়ের পর তিনি এই গ্রামে এসে গাছটিকে যে অবস্থায় দেখেছিলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় তেমনই দেখছেন। বর্তমান মালিকপক্ষের সদস্য বাচ্চু শেখ ও তার ভাইদের মতে, তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ এটি রোপণ করেছিলেন, কিন্তু ঠিক কখন বা কে করেছিলেন সেই সঠিক ইতিহাস তাদের অজানা।

কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাধারণ আমগাছের আয়ুষ্কাল প্রায় একশ বছর হয়। যদিও কিছু গাছ তার চেয়ে বেশি সময় বাঁচতে পারে, তবুও এর বয়স ২০০ বছর কি না তা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। গাছটির বিস্তৃতি প্রায় ৫৪ থেকে ৫৭ শতাংশ জমিজুড়ে। এর নয়টি প্রধান কাণ্ড আলাদা আলাদা গাছের মতো মাটির সঙ্গে মিশে চারদিকে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে, যা একে অতিকায় রূপ দিয়েছে।

শুধু আকৃতি নয়, ফলনের দিক থেকেও এই গাছটি অনন্য। স্থানীয়দের হিসাবমতে, মৌসুমভেদে এখান থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মণ পর্যন্ত আম পাওয়া যায়। এই আম খেতে বেশ সুস্বাদু এবং স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মৌসুমে গাছটি যখন আমে ভরে ওঠে, তখন তা এক আকর্ষণীয় দৃশ্যের অবতারণা করে, যা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়।

প্রতিদিন দেড় থেকে দুই শতাধিক মানুষ এই গাছ দেখতে ভিড় করেন। বিশেষ দিন, উৎসব বা ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। গাছটিকে ঘিরে পহেলা বৈশাখে মেলাও বসে। স্থানীয় শিক্ষার্থী সোহান খান ও বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, এলাকার গর্ব হিসেবে এই গাছ পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। তাদের প্রত্যাশা, গাছটিকে ঘিরে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হোক, যা এলাকার মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

গাছটির কাছে পৌঁছানোর পথটিও বেশ সহজ। রাজধানী ঢাকা থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে ভাঙ্গা ও ভাটিয়াপাড়া হয়ে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নামা যায়। ঢাকার অবস্থান ও রুটভেদে এই দূরত্ব প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে ইট বিছানো রাস্তা ধরে মাত্র ৩০০ গজ এগোলেই দেখা মেলে এই অতিকায় আমগাছের। গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে হিরণ্যকান্দির দূরত্ব প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার এবং ভাঙ্গা গোলচত্বর থেকে ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মতো।

পর্যটন সুবিধা বাড়াতে দুই বছর আগে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গাছটির কাছে যাওয়ার জন্য প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং মহাসড়কের পাশে নির্দেশিকা সাইনবোর্ডও বসানো হয়েছে। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, এলাকাটির ঐতিহ্য হিসেবে এই গাছ সংরক্ষণে আরও বড় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

বন বিভাগের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। জেলা বন কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, গাছটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। সব মিলিয়ে, এই অতিকায় আমগাছটি কেবল একটি গাছ নয়, এটি হিরণ্যকান্দি গ্রামের দীর্ঘ জীবনের নীরব সাক্ষী এবং বিরল এক প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই বয়স নিয়ে যত মতভেদই থাক, শতবর্ষের নিচে নামাতে রাজি নন গ্রামের কেউই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখান থেকে পূর্ব দিকে ইট বিছানো সড়ক ধরে প্রায় ৩০০ গজ এগোলেই চোখের সামনে খুলে যাবে সবুজের এক বিশাল পরিসর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম দেখায় বোঝা কঠিন, এত বড় ছায়া আসলে একটি গাছের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও মোটা ডাল মাটিকে ছুঁয়ে আবার ওপরে উঠে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাছের নিচে দাঁড়ালে চারপাশের ব্যস্ততা যেন কিছুটা থেমে যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাঠ্য বইয়ে বিতর্ক: এনসিটিবির ৯ কর্মকর্তাকে বদলি, গচ্চা ১৭ কোটি টাকা

Verified by MonsterInsights

গোপালগঞ্জের অতিকায় আমগাছ: এক গাছেই যেন সবুজ পাহাড়

আপলোডের সময় : 09:57:12 am, Friday, 25 September 2026

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের হিরণ্যকান্দি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়কর আমগাছ। দূর থেকে দেখলে এটিকে একটি সাধারণ গাছ মনে হলেও কাছে গেলে ভুল ভাঙে। এর বিশাল ডালপালা, মাটির কাছাকাছি নেমে আসা কাণ্ড এবং ঘন পাতার আচ্ছাদন দেখে মনে হয়, এটি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি কোনো সবুজ পাহাড় বা স্থাপত্য। স্থানীয়রা একে ‘শতবর্ষী আমগাছ’ হিসেবেই চেনেন।

গাছটির সুনির্দিষ্ট বয়স নিয়ে কোনো লিখিত দলিল নেই, তবে স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে বিশাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের অনেক প্রবীণ বাসিন্দার ধারণা, গাছটির বয়স একশ থেকে দুইশ বছরের মধ্যে। হিরণ্যকান্দির একজন প্রবীণ নারী জানান, পাঁচ দশকেরও বেশি আগে বিয়ের পর তিনি এই গ্রামে এসে গাছটিকে যে অবস্থায় দেখেছিলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় তেমনই দেখছেন। বর্তমান মালিকপক্ষের সদস্য বাচ্চু শেখ ও তার ভাইদের মতে, তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ এটি রোপণ করেছিলেন, কিন্তু ঠিক কখন বা কে করেছিলেন সেই সঠিক ইতিহাস তাদের অজানা।

কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাধারণ আমগাছের আয়ুষ্কাল প্রায় একশ বছর হয়। যদিও কিছু গাছ তার চেয়ে বেশি সময় বাঁচতে পারে, তবুও এর বয়স ২০০ বছর কি না তা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। গাছটির বিস্তৃতি প্রায় ৫৪ থেকে ৫৭ শতাংশ জমিজুড়ে। এর নয়টি প্রধান কাণ্ড আলাদা আলাদা গাছের মতো মাটির সঙ্গে মিশে চারদিকে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়েছে, যা একে অতিকায় রূপ দিয়েছে।

শুধু আকৃতি নয়, ফলনের দিক থেকেও এই গাছটি অনন্য। স্থানীয়দের হিসাবমতে, মৌসুমভেদে এখান থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মণ পর্যন্ত আম পাওয়া যায়। এই আম খেতে বেশ সুস্বাদু এবং স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মৌসুমে গাছটি যখন আমে ভরে ওঠে, তখন তা এক আকর্ষণীয় দৃশ্যের অবতারণা করে, যা দর্শনার্থীদের আনন্দ দেয়।

প্রতিদিন দেড় থেকে দুই শতাধিক মানুষ এই গাছ দেখতে ভিড় করেন। বিশেষ দিন, উৎসব বা ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। গাছটিকে ঘিরে পহেলা বৈশাখে মেলাও বসে। স্থানীয় শিক্ষার্থী সোহান খান ও বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, এলাকার গর্ব হিসেবে এই গাছ পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। তাদের প্রত্যাশা, গাছটিকে ঘিরে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হোক, যা এলাকার মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বয়ে আনবে।

গাছটির কাছে পৌঁছানোর পথটিও বেশ সহজ। রাজধানী ঢাকা থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে ভাঙ্গা ও ভাটিয়াপাড়া হয়ে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নামা যায়। ঢাকার অবস্থান ও রুটভেদে এই দূরত্ব প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে ইট বিছানো রাস্তা ধরে মাত্র ৩০০ গজ এগোলেই দেখা মেলে এই অতিকায় আমগাছের। গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে হিরণ্যকান্দির দূরত্ব প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার এবং ভাঙ্গা গোলচত্বর থেকে ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মতো।

পর্যটন সুবিধা বাড়াতে দুই বছর আগে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গাছটির কাছে যাওয়ার জন্য প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা হয়েছে এবং মহাসড়কের পাশে নির্দেশিকা সাইনবোর্ডও বসানো হয়েছে। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী আবুল কালাম আজাদ মনে করেন, এলাকাটির ঐতিহ্য হিসেবে এই গাছ সংরক্ষণে আরও বড় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

বন বিভাগের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। জেলা বন কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, গাছটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। সব মিলিয়ে, এই অতিকায় আমগাছটি কেবল একটি গাছ নয়, এটি হিরণ্যকান্দি গ্রামের দীর্ঘ জীবনের নীরব সাক্ষী এবং বিরল এক প্রাকৃতিক সম্পদ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই বয়স নিয়ে যত মতভেদই থাক, শতবর্ষের নিচে নামাতে রাজি নন গ্রামের কেউই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখান থেকে পূর্ব দিকে ইট বিছানো সড়ক ধরে প্রায় ৩০০ গজ এগোলেই চোখের সামনে খুলে যাবে সবুজের এক বিশাল পরিসর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম দেখায় বোঝা কঠিন, এত বড় ছায়া আসলে একটি গাছের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কোথাও মোটা ডাল মাটিকে ছুঁয়ে আবার ওপরে উঠে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাছের নিচে দাঁড়ালে চারপাশের ব্যস্ততা যেন কিছুটা থেমে যায়।