
উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উনের মৃত্যু হয়েছে—এমন গুঞ্জন যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁর নতুন ছবি প্রকাশ করা হয়। কিম জং–উন কতটা বিলাসী জীবনযাপন করেন, অবকাশকেন্দ্রের কাছে বড় বড় বিলাসবহুল নৌযান কি তাঁর। তবে কিম জং–উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা তাঁর পূর্বসূরিদের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত।
৪২ বছর বয়সী কিমকে প্রদর্শনীতে মেয়ে কিম জু আয়ের সঙ্গে বেশ সুস্থ অবস্থায় দেখা গেছে। মেয়ে কিম জুকে সঙ্গে নিয়ে একটি পোশাক ও জুতার প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন তিনি। কিন্তু এর কিছুদিন পরই কিমকে জনসমক্ষে দেখা যায়।
রোদং সিনমুন পত্রিকায় প্রকাশিত এই ছবিগুলো পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা তুলে ধরার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও ছবি তোলার সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
সম্প্রতি ওয়ানজুন শিয়ে নামের একজন চীনা ভিন্নমতাবলম্বী কিমের মৃত্যুর খবরটি প্রচার করেন। তিনি নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দেন। শিয়ে দাবি করেন, মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণের কারণে কিমকে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। এর আগে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মৃত্যু নিয়েও তিনি একই ধরনের প্রমাণহীন দাবি করেছিলেন। দলটি চীনা কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে।
উত্তর কোরিয়ার জটিল ও গোপনীয় রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে দেশটির ভেতরে প্রকৃত অবস্থা জানা প্রায় অসম্ভব। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যুর খবরের সমর্থনে কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ইয়োনহাপকে নিশ্চিত করেছে যে, এমন কোনো পরিস্থিতির কোনো লক্ষণ বা প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
এমন গুজবের ভিত্তি মূলত উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। কিম জং–উনের আগের প্রজন্ম অর্থাৎ তাঁর বাবা কিম জং ইল বা দাদা কিম ইল সুংয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ছিল সুপরিকল্পিত। কিম জং–উন নিজেই ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর আগেই ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পরবর্তী নেতৃত্ব কার হাতে যাবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর আগেই উত্তরসূরি হিসেবে ছেলের অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবার দেশটি শাসন করছে। ফলে কিম জং ইলের ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে নির্বিঘ্ন ছিল।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, কিম জং–উন সম্ভবত তাঁর মেয়েকে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রস্তুত করছেন। ১৩ বছর বয়সী কিম জু আয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বাবার সঙ্গে উপস্থিত থাকছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে এখনো কোনো নারী নেতৃত্ব দেননি। অল্প বয়স ও লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে ক্ষমতার লড়াইয়ে তাঁকে ঘিরে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। অল্প বয়সের কারণে ক্ষমতার লড়াইয়ে তিনিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
কিমের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অত্যাধিক ওজন এবং ধূমপানের অভ্যাস তাঁর হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এসব রোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব উদ্বেগের কারণেই মূলত তাঁর যেকোনো শারীরিক অসুস্থতার খবর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। ২০০৮ সালে বাবা কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর উনকে দ্রুত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করা হয়।
কিমের আকস্মিক মৃত্যু পুরো অঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে কিংবা উত্তর কোরিয়া সীমান্তে কোনো শরণার্থী সংকট তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ওয়াশিংটন সবসময় উদ্বিগ্ন থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন প্রায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতিও এই উত্তেজনার একটি বড় কারণ। বিশ্বে সবচেয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখা রাষ্ট্রগুলোর একটি উত্তর কোরিয়া। সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা কিংবা শরণার্থীর ঢল সামাল দিতে চীন উত্তর কোরিয়া সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারত। দেশটির কূটনৈতিক মিশনগুলোর আশপাশেও তৎপরতা বাড়তে পারত। দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া উত্তর কোরীয়রা প্রায়ই চীন সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে তথ্য পান। তিন কিমের ৭৮ বছর: যেভাবে টিকে আছে উত্তর কোরিয়া। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ। এসব প্রশ্নে বেইজিং ও সিউল উদ্বিগ্ন।
এর আগেও ২০২০ সালে কিমের হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর গুজব বেশ জোরালো হয়েছিল, যা পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়া নিজেই অনেক সময় বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে অথবা কিমের রহস্যময় জীবনযাত্রা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ ফায়দা নিতে চায়। আর এ সুযোগেই বারবার ছড়ায় নানা জল্পনা। ২০২০ সালে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, হৃদ্রোগের অস্ত্রোপচারের পর কিমের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’।
এসব গুজবের পেছনে গোয়েন্দা তথ্যের কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি থাকে না। কোনো কোনো তথ্য ‘অত্যন্ত সম্ভাব্য’ মনে হলেও নিশ্চিত সত্য হিসেবে তা উপস্থাপন করা কঠিন। কিম জং–উনের উত্তরসূরি নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত এমন গুজব বারবার ফিরে আসারই সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিশেষে, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও ক্ষমতার উত্তরাধিকারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক নজরদারিতে সবসময় থাকে। কিমের গতিবিধি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ই আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ানজুন শিয়ের মতো ব্যক্তিদের দাবির কোনো প্রমাণ না থাকলেও, এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে পিয়ংইয়ংয়ের নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের উৎকণ্ঠা এখনো কাটেনি। ছবিগুলো কখন তোলা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও শিয়ের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধির নাম 

























