বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি জাপানের

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থান তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এই বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য জানানো হয়। গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।

বিনিয়োগের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দুই নেতা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্প মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এছাড়া ঢাকার এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি, এর আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিও উভয় নেতা স্বাগত জানিয়েছেন। ইয়েন ঋণ প্রকল্পটিকে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের অন্যতম সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে ভূমিকার স্বীকৃতি দেন তাকাইচি। তাঁরা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাসহ সব পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে তাকাইচি তাঁদের জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি জাপানের সমর্থন জানান। রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব বলে দুই নেতা একমত হন। অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই সব জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দেন।

দুই দেশ জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে, যা বাণিজ্য ও শিল্পের বহুমুখীকরণে নতুন পথ উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা এবং যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্ল্যাটফর্ম ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো নিয়ে দুই নেতা তাদের সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ উদ্যোগের চারটি অগ্রাধিকার হলো-যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিটি দেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এ দুই নেতা। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেলের মজুত বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেন দুই নেতা।

জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন কৌশল এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে। ‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় এটিই জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্ব পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা গভর্ন্যান্স প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা। স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২)’ প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে দুই নেতা স্বাগত জানান।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও তার কার্যকারিতাকে দুই নেতা ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। ওডিএ কর্মসূচির আওতায় একটি টহল জাহাজ প্রদান এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির অধীনে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধানের বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন। করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও এ অঙ্গীকার প্রযোজ্য হবে।

বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং সে দেশের জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার সংকট।

একই সঙ্গে তিনি তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

দুই নেতা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকাইচি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে দুই নেতা আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে জাপানি ভাষাশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং বৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবিষয়ক বিনিময় কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ তাদের সম্মতি প্রকাশ করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারি বেতন ও বকেয়া পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ

Verified by MonsterInsights

বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি জাপানের

আপলোডের সময় : 08:52:45 am, Wednesday, 28 October 2026

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন জাপানি বিনিয়োগ এবং এর ফলে দুই লাখ কর্মসংস্থান তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এই বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনার তথ্য জানানো হয়। গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এ বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।

বিনিয়োগের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দুই নেতা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্প মূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তারেক রহমানের সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এছাড়া ঢাকার এমআরটি লাইনগুলোর নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি, এর আঞ্চলিক নিরাপত্তাগত প্রভাব, বাস্তুচ্যুতি এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টিও উভয় নেতা স্বাগত জানিয়েছেন। ইয়েন ঋণ প্রকল্পটিকে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের অন্যতম সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা টেকসই সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে একমত হন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে ভূমিকার স্বীকৃতি দেন তাকাইচি। তাঁরা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রোহিঙ্গাসহ সব পক্ষ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে তাকাইচি তাঁদের জন্য অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি জাপানের সমর্থন জানান। রোহিঙ্গাসহ বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসই উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়েই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব বলে দুই নেতা একমত হন। অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই সব জাহাজের নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দেন।

দুই দেশ জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে, যা বাণিজ্য ও শিল্পের বহুমুখীকরণে নতুন পথ উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। জাপানি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা এবং যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) প্ল্যাটফর্ম ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো নিয়ে দুই নেতা তাদের সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ উদ্যোগের চারটি অগ্রাধিকার হলো-যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব উৎসাহিত করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিটি দেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার গুরুত্বের ওপর জোর দেন এ দুই নেতা। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেলের মজুত বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেন দুই নেতা।

জাপানের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন কৌশল এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া সহজ, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম হবে। ‘পার্টনারশিপ অন ওয়াইড এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস রেজিলিয়েন্স এশিয়া’ বা ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় এটিই জাপানের প্রথম ইয়েন ঋণ প্রকল্প।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্ব পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা গভর্ন্যান্স প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল রূপান্তর, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আইসিটি পেশাজীবী তৈরি এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের গুরুত্ব স্বীকার করেন দুই নেতা। স্থানীয় সরকারগুলোর প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইয়েন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ‘উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (ফেজ-২)’ প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিকে দুই নেতা স্বাগত জানান।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও তার কার্যকারিতাকে দুই নেতা ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। ওডিএ কর্মসূচির আওতায় একটি টহল জাহাজ প্রদান এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির অধীনে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র অনুসন্ধানের বিষয়েও তারা একমত হয়েছেন। করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ প্রেরণ এবং লাইসেন্স প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও এ অঙ্গীকার প্রযোজ্য হবে।

বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং সে দেশের জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। জাপানের ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে জরুরি সহায়তা ঋণ’ কর্মসূচির আওতায় ৫০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তার জন্য জাপানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও মিয়ানমার সংকট।

একই সঙ্গে তিনি তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

দুই নেতা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকাইচি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অভিন্ন মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে দুই নেতা আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে জাপানি ভাষাশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং বৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবিষয়ক বিনিময় কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ তাদের সম্মতি প্রকাশ করেছে।