
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী এমন কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে আয়োজিত বিশেষ প্রতিবেদনের চতুর্থ পর্বে আজ থাকছে এমন চার শিক্ষার্থীর কথা, যারা অভাবকে সঙ্গী করেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছে। সংসারের টানাপোড়েন আর মা-বাবার কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখেছে তারা, আর সেই কষ্ট লাঘবের স্বপ্নই তাদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তুলেছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের শারমিন আক্তার ইকরচালী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবা সিরাজুল ইসলাম দিনমজুর এবং মা মনজিলা বেগম গৃহিণী। পাঁচ সদস্যের পরিবারে বসতভিটা ও ২০ শতক আবাদি জমি ছাড়া তেমন কোনো সম্পদ নেই। নিজের জমিতে চাষাবাদ করে সংসার না চলায় বাবার দিনমজুরিই একমাত্র ভরসা। শারমিন নিজের পড়ার খরচ জোগাতে গ্রামের শিশুদের পড়িয়েছে। সে চিকিৎসক হতে চায়, কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে তার পরিবার দুশ্চিন্তায়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জুলফিকার ইসলাম শারমিনকে অদম্য মেধাবী হিসেবে অভিহিত করে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা প্রকাশ করেছেন।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়নের ভুইয়ট গ্রামের সুসমিতা রানী মাহাতোও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো সুসমিতা পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার বিষমডাঙা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। দাদার সামান্য আবাদি জমিই তাদের সম্বল। তার বড় বোন সৌমিতা রানী মাহাতো সিরাজগঞ্জ নার্সিং কলেজে পড়ছেন। সুসমিতার মা শিল্পী রানী মাহাতো জানান, মেয়ের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনার খরচ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক চঞ্চল কুমার মাহাতো মেধাবী এই শিক্ষার্থীর জন্য বিত্তবানদের সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
নীলফামারী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে দিপ্ত চন্দ্র রায়। জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের ডাঙাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা দিপ্ত প্রতিদিন দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করত। তার বাবা দ্বিজেন্দ্র নাথ রায় ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালান। সহায়-সম্বল বলতে ছয় শতাংশের ভিটেটুকুই। দিপ্তর বড় বোন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাওয়া বাবার পক্ষে দিপ্তকে ঢাকার নটর ডেম কলেজে পড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অধ্যক্ষ মো. সাদেকুল ইসলাম জানান, দিপ্ত অত্যন্ত মেধাবী ও ভদ্র, সহযোগিতা পেলে সে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে কাশফিয়া নুরইন। শহরের মিস্ত্রিপাড়া মহল্লার জীর্ণ ভাড়া বাসায় তাদের বসবাস। বাবা নাসিম আহমেদ ছোট পান দোকানদার এবং মা ফারজানা বেগম গৃহিণী। পরিবারের অভাব মেটাতে কাশফিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি দর্জির দোকানে শার্টে বোতাম লাগানোর কাজ করেছে। বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কাশফিয়া তাদের ফার্স্ট গার্ল। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা কাশফিয়ার বাবা নাসিম আলী মেয়ের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
এই চার শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি। অভাবের সংসারে স্বপ্ন দেখা সহজ হলেও তা ধরে রাখা কঠিন। এখন তাদের সবার লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা, কিন্তু সেই পথের আর্থিক বাধা তাদের পরিবারের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিজের জমিতে চাষাবাদ করেও সংসারের তিন বেলা খাবার জোটে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংসারের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও থেমে থাকেনি শারমিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জানি না, আমার লেখাপড়া কত দূর পর্যন্ত যাবে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাকে অবলম্বন করে চালিয়ে গেছে পড়ালেখা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নানা সংকটের মধ্যেও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে সে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার জিপিএ-৫ প্রাপ্তি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পরিবারটিতে আনন্দ নিয়ে এলেও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ালেখা নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাতেই সংসারের সবার কোনোমতে দিন চলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুসমিতা বলে, ‘উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো পড়ালেখা করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই।