
ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় দখলকৃত ভূখণ্ডে তাদের অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে তিনটি প্রধান কৌশল অবলম্বন করা হতো। প্রথমত, স্থানীয় জনগোষ্টীর ভেতর থেকেই একটি কায়েমি স্বার্থবাদী শ্রেণি তৈরি করা হতো, যারা নিজ স্বার্থে বিদেশি শাসকদের শাসন টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করত। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস চর্চার নামে বিকৃত বয়ান প্রচার করা হতো, যাতে স্থানীয়দের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয় এবং তাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মায়। তৃতীয়ত, একটি ‘শিক্ষিত’ এলিট সম্প্রদায় গড়ে তোলা হতো, যারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তির সামাজিক ও ভাবাদর্শিক ভিতকে মজবুত করত।
এ ধরনের নতুন শ্রেণি ও এলিট তৈরির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার ছিল ঔপনিবেশিক ভাষা ও নতুন শিক্ষানীতি। স্থানীয়দের তাদের নিজস্ব ভাষা ও ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি জনবিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরি করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯২ সালের শুরুর দিকে তার ‘বাংলাসাহিত্যের প্রতি অবজ্ঞা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “যাহারা অনেক ইংরাজি কেতাব পড়িয়াছেন তাঁহারা অনেকেই আধুনিক বাংলা লেখা ও লেখকদের প্রতি কৃপাকটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া থাকেন। বোধ করি ইতর-সাধারণ হইতে আপনাকে স্বতন্ত্র করিয়া লইয়া অভিমানে তাঁহারা আপাদমস্তক কণ্টকিত হইয়া উঠেন।”
ভারতে ইউরোপীয় উপনিবেশায়নের সূত্রপাত হয় ১৫০৩ সালে, যখন কেরালার কোচিন বন্দরে পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৫১০ সালে তারা গোয়া শহর দখল করে সামরিক দুর্গ নির্মাণ করে। ১৫১৬ সালে পর্তুগিজরা বাংলায় প্রবেশ করে এবং ১৫৩৬ সালে তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ্’র অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রামে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। তবে জলদস্যুতা ও বলপূর্বক ধর্মান্তকরণের মতো অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর ১৬৩২ সালে সম্রাট শাহজাহান হুগলি থেকে এবং ১৬৬৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব চট্টগ্রাম থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করেন। গোয়া থেকে পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটে অনেক পরে, ১৯৬১ সালে ভারত সরকারের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাসও অনেকটা একইভাবে বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। ১৬০৯ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ইংরেজ বণিকরা বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার অনুমতি পায়। ১৯১২ সালের মধ্যে সুরাটে তারা প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করলেও, প্রকৃত শাসন ও শোষণের কাঠামো গড়ে ওঠে ১৬৩৩ সালে উড়িষ্যার বালাসোরে কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলা প্রদেশে কারখানা গড়ার অনুমতি পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এরপর আরও ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিলেও, তৎকালীন প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল। উপনিবেশবাদী শিক্ষার বদৌলতে তৈরি হওয়া এলিট শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশ পরবর্তীতে স্বাজাত্যবোধ ও স্বাধীনতার দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তানজানিয়ার জুলিয়াস নেরেরে, ঘানার কোয়ামে নক্রুমা, গিনির আহমেদ সেকু তুরে ও আমিলকার কাবরালের মতো নেতারা সেই ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকেই বেরিয়ে এসে আপন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি -৬। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথমত, দখলীকৃত ভূখণ্ডে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, বৈষয়িক অর্থে, নতুন ধরনের কায়েমি স্বার্থ সৃষ্টি করা এবং সেই বৈষয়িক স্বার্থকে ঘিরে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে একটি নতুন কায়েমি স্বার্থবাদী শ্রেণির সৃষ্টি করা- যে শ্রেণিটি আপন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দখলদারত্ব ও শাসনব্যবস্থার ‘ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস গ্রহণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভক্তি সৃষ্টি করে ঔপনিবেশিক শাসনকে দীর্ঘায়িত করার পথ প্রশস্ত করার ক্ষেত্রেও উপনিবেশবাদী অনৈতিহাসিক ‘ইতিহাস’ চর্চা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরকম একটি নতুন শ্রেণির সৃষ্টি ও বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ দেশে দেশে যে দু’টি প্রধান কার্যকর উপায় অবলম্বন করেছে, তা হলো নতুন ভাষা ও শিক্ষানীতির প্রবর্তন ও প্রচলন নিশ্চিত করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পর্যায়ে যা উপলব্ধি করা জরুরি তা হলো, কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে তার অকৃত্রিম সম্পর্কটি সেই জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেননা, কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাই তার আপন ইতিহাস ও ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা ও স্বপ্ন, ইত্যাদি ধারণ করে থাকে, তার তাবৎ ঐতিহাসিক ‘স্মৃতির ভাণ্ডার’ হিসেবে বিরাজমান থাকে, আর সেই ভাষার মাধ্যমেই তা ওই জনগোষ্ঠীর ভেতর প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয় ও নিরন্তর জারি থাকে।
প্রতিনিধির নাম 

























