
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন কেবল সাহিত্যচর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে আপসহীন রাজনীতিবিদ ও সমাজসচেতন চিন্তাবিদ। রাজনৈতিক দর্শন বলতে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের যে মৌলিক ভিত্তি বোঝায়, নজরুল তাঁর লেখনী ও কর্মের মাধ্যমে সেই দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সমাজে ধনী-দরিদ্র ও উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ দূর করে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
১৯২৫ সালে নজরুল প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হন। ওই বছরের শেষ দিকে হেমন্তকুমার সরকার, কুতুবুদ্দীন আহমদ ও শামসুদ্দীন হুসাইনের সঙ্গে মিলে তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে উদ্যোগী হন, যা ইতিহাসে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ নামে পরিচিত। এই দলের আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে ‘সাপ্তাহিক লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর এর প্রথম বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। নজরুলের সম্পাদনা ও পরিচালনায় এই পত্রিকাটি তৎকালীন শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। এমনকি লেলিনগ্রাদের প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক প্রমথ দত্ত (যিনি আলী দাউদ আলী দত্ত নামে পরিচিত ছিলেন) ১৯২৬ সালের ১০ আগস্ট এক চিঠিতে ‘লাঙল’ পত্রিকার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে, এটি ভারতের বঞ্চিত সম্প্রদায়ের জাগরণশীল শ্রেণি-চেতনার প্রতীক।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারণে নজরুলকে বারবার রাষ্ট্রশক্তির রোষানলে পড়তে হয়েছে। ১৯২৩ সালে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি রচনার দায়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কারাগারে বন্দি থাকাকালীন তিনি রাজবন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও অধিকার হরণের প্রতিবাদে টানা ৩৯ দিন ঐতিহাসিক অনশন পালন করেছিলেন। তাঁর এই গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতবর্ষের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক ও যুবসমাজ তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে ১৯২৬ সালে নজরুল ঢাকা কেন্দ্র থেকে ‘কেন্দ্রীয় আইনসভা’র নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তা ও দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৯ সালে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে তাঁকে সর্বভারতীয় গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়। কবির জীবনের এই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক যাত্রার এক পর্যায়ে ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অ-প্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন, যা ছিল বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজনীতির দর্শন (Political Philosophy) হলো দর্শনের এমন একটি শাখা, যা রাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক উৎস যেমন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, তেমনি সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে তার সমাধান নিশ্চিত করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেখানে রাজনীতির ধরন, জনগণের মুক্তি, স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মোটকথা, গণমানুষের ন্যায়বিচার, অধিকার নিশ্চিতকরণে আইন প্রণয়ন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের ফলে সমগ্র মানুষের অধিকার বিপন্ন হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গণতন্ত্রের সুফল থেকে ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর স্টিমরোলার চালানো হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষের ভাগ্যবঞ্চিত জনগণের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ডাক দেন।