ঢাকা কাস্টম হাউসে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ঘুষ দিয়ে খালাস হচ্ছে নিষিদ্ধ ল্যাপটপ

ঢাকা কাস্টম হাউসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং আমদানিকারকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে নানা অনিয়ম চালিয়ে আসছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ঘুষের বিনিময়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ পুরোনো ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পণ্য খালাস করছে এই চক্রটি। এছাড়া বন্ডেড সুবিধায় আনা পণ্য নিয়মবহির্ভূতভাবে খোলাবাজারে বিক্রির গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, ১০ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং ৮ জন আমদানিকারক এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এদের মধ্যে তাজিয়া এন্টারপ্রাইজের জীবন চৌধুরী, সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মো. শাজাহান, আরিফা লজিস্টিক লিমিটেডের রুবেল, ফাহিম ফাইভ স্টারের উজ্জ্বল, মনোয়ারার সাইদুল, লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন, থ্রি আরের গোলাম রাব্বি, ডে লাইটের তাজুল ইসলাম, মমতা এন্টারপ্রাইজের মমতাজ উদ্দিন এবং আনান ইন্টারন্যাশনালের শামীম অন্যতম। বিশেষ করে জীবন চৌধুরী, মো. শাজাহান ও রুবেল মিথ্যা ঘোষণায় পুরোনো ল্যাপটপ ও এলসিডি দ্রুত খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সিন্ডিকেটটি কেবল ল্যাপটপ আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা শুল্ক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাণিজ্যিক পণ্যকে শিল্পপণ্য হিসেবে দেখিয়ে কম শুল্কে খালাস করে সরকারের রাজস্বের বড় ক্ষতি করছে। এছাড়া বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারকারী আটটি প্রতিষ্ঠানের নামও প্রতিবেদনে এসেছে। এগুলো হলো তুয়ানি প্যাকেজিং, তাম্মি এক্সেসরিজ, রেডিয়ান্ট এক্সেসরিজ, হোলি ইলাস্টিক, তাকওয়া ট্রেড, মিরহা এক্সেসরিজ, ওমর গার্মেন্টস এবং ডংহ বিডি লিমিটেড।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে অধিকাংশের সাড়া পাওয়া যায়নি। লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন দাবি করেছেন, তিনি কোনো পুরোনো ল্যাপটপ আমদানি করেন না। জীবন চৌধুরী শুরুতে কথা বলার আশ্বাস দিলেও পরে আর সাড়া দেননি। এছাড়া মো. শাজাহান, রুবেল, শামীম ও উজ্জ্বলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

এই অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর। সংস্থাটি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান জানিয়েছেন, যেসব এয়ারওয়ে বিলে পুরোনো ল্যাপটপ আমদানির তথ্য মিলেছে, সেগুলোতে লক দেওয়া হয়েছে। তিনি বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে দ্রুত কমিটি গঠন করা হবে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মসিউর রহমান জানান, এনবিআর থেকে চিঠি পাওয়ার পর তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানিয়েছেন, কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে দ্রুতই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে এনবিআরের শুল্ক নীতি ও আইসিটি বিভাগের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীরের সাথে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি এবং কোনো মন্তব্য প্রদান করেননি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এনবিআরে পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি এখন তদন্তাধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ঢাকা কাস্টম হাউসকেও বিষয়টি আমলে নিতে বলা হয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাঘাটায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, ড্রেজার মেশিন ও সরঞ্জাম জব্দ

Verified by MonsterInsights

ঢাকা কাস্টম হাউসে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ঘুষ দিয়ে খালাস হচ্ছে নিষিদ্ধ ল্যাপটপ

আপলোডের সময় : 11:48:42 am, Thursday, 3 September 2026

ঢাকা কাস্টম হাউসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং আমদানিকারকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে নানা অনিয়ম চালিয়ে আসছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ঘুষের বিনিময়ে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ পুরোনো ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পণ্য খালাস করছে এই চক্রটি। এছাড়া বন্ডেড সুবিধায় আনা পণ্য নিয়মবহির্ভূতভাবে খোলাবাজারে বিক্রির গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানিয়েছে, ১০ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং ৮ জন আমদানিকারক এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এদের মধ্যে তাজিয়া এন্টারপ্রাইজের জীবন চৌধুরী, সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মো. শাজাহান, আরিফা লজিস্টিক লিমিটেডের রুবেল, ফাহিম ফাইভ স্টারের উজ্জ্বল, মনোয়ারার সাইদুল, লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন, থ্রি আরের গোলাম রাব্বি, ডে লাইটের তাজুল ইসলাম, মমতা এন্টারপ্রাইজের মমতাজ উদ্দিন এবং আনান ইন্টারন্যাশনালের শামীম অন্যতম। বিশেষ করে জীবন চৌধুরী, মো. শাজাহান ও রুবেল মিথ্যা ঘোষণায় পুরোনো ল্যাপটপ ও এলসিডি দ্রুত খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সিন্ডিকেটটি কেবল ল্যাপটপ আমদানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা শুল্ক কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বাণিজ্যিক পণ্যকে শিল্পপণ্য হিসেবে দেখিয়ে কম শুল্কে খালাস করে সরকারের রাজস্বের বড় ক্ষতি করছে। এছাড়া বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহারকারী আটটি প্রতিষ্ঠানের নামও প্রতিবেদনে এসেছে। এগুলো হলো তুয়ানি প্যাকেজিং, তাম্মি এক্সেসরিজ, রেডিয়ান্ট এক্সেসরিজ, হোলি ইলাস্টিক, তাকওয়া ট্রেড, মিরহা এক্সেসরিজ, ওমর গার্মেন্টস এবং ডংহ বিডি লিমিটেড।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে অধিকাংশের সাড়া পাওয়া যায়নি। লাবিবা এন্টারপ্রাইজের লিটন দাবি করেছেন, তিনি কোনো পুরোনো ল্যাপটপ আমদানি করেন না। জীবন চৌধুরী শুরুতে কথা বলার আশ্বাস দিলেও পরে আর সাড়া দেননি। এছাড়া মো. শাজাহান, রুবেল, শামীম ও উজ্জ্বলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

এই অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর। সংস্থাটি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান জানিয়েছেন, যেসব এয়ারওয়ে বিলে পুরোনো ল্যাপটপ আমদানির তথ্য মিলেছে, সেগুলোতে লক দেওয়া হয়েছে। তিনি বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে দ্রুত কমিটি গঠন করা হবে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহা. মসিউর রহমান জানান, এনবিআর থেকে চিঠি পাওয়ার পর তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানিয়েছেন, কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে দ্রুতই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে এনবিআরের শুল্ক নীতি ও আইসিটি বিভাগের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীরের সাথে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি এবং কোনো মন্তব্য প্রদান করেননি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এনবিআরে পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি এখন তদন্তাধীন রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ঢাকা কাস্টম হাউসকেও বিষয়টি আমলে নিতে বলা হয়েছে।