
দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই ও রক্তক্ষয়ী পথপরিক্রমা শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তবে এই ক্ষমতার মসনদ দলটির জন্য স্বস্তির নয়, বরং এক অদৃশ্য কাঁটায় মোড়ানো চ্যালেঞ্জ। জনপ্রিয় প্রবাদ অনুযায়ী, ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’—বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সমীকরণ যেন এক নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে অনেকটা ‘জলে আওয়ামী লীগ, ডাঙায় জামায়াত’ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা দলটিকে এক শ্বাসরোধী ও জটিল সংকটে নিমজ্জিত করেছে। দীর্ঘ এক শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে, বহু ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সমাসীন। এই প্রবাদটিকে যদি আমরা সমসাময়িক বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে পাঠ করি, তবে তা অদ্ভুত ও নিখুঁত সমীকরণে রূপ নেয়: ‘জলে আওয়ামী লীগ, ডাঙায় জামায়াত’। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েও আজ বিএনপি এমন ত্রিমুখী ও শ্বাসরোধী মনস্তাত্ত্বিক চাপে নিপতিত, যাকে আক্ষরিক অর্থেই বলা চলে ‘তথৈবচ’ অবস্থা।
দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ এবং আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আওয়ামী লীগ যে গভীর শেকড় গেড়েছে, তা রাতারাতি উপড়ে ফেলা অসম্ভব। সরকারি কাঠামোর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা এই ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য শক্তি বিএনপির জন্য ‘জলের নিচে থাকা কুমির’-এর মতো বিপজ্জনক। তারা সরাসরি কোনো সংঘাতের পথে না গিয়ে বরং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গড়িমসি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে সরকারের সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারি ফাইলে সই না হওয়া থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা—সবকিছুই এই অদৃশ্য শক্তির পরিকল্পিত কৌশল, যা বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় বারবার হোঁচট খেতে বাধ্য করছে। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আওয়ামী লীগের ‘ডিপ স্টেট’ ক্ষমতার পালাবদল হয়তো দৃশ্যমান রাজপথ ও সংসদ ভবন থেকে পূর্বতন শাসকগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করেছে, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের অদৃশ্য অন্দরমহলে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অন্যদিকে, রাজপথের পরিস্থিতিও বিএনপির জন্য অনুকূলে নেই। একসময়ের দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এখন আর আজ্ঞাবহ রাজনৈতিক শক্তি নয়। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর জামায়াত নিজেদের এক স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। ডানপন্থী ও ইসলামি রাজনীতির যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, তা দখলে জামায়াত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী ও সুসংগঠিত। তৃণমূল পর্যায়েও এখন বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি চাইলেই কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না, কারণ তাতে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগের আশঙ্কা থাকে। আবার নীরবতা পালন করলে রাজপথে নিজস্ব অবস্থান হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। রাজনীতির অমোঘ নিয়ম হলো, ক্ষমতার পটপরিবর্তন শুধু নতুন দিগন্তেরই উন্মোচন করে না, নতুন এবং জটিলতর সংকটেরও জন্ম দেয়। অন্যদিকে রয়েছে তাদের বিশাল সাহিত্য, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি পরিসর।
এই বহিঃশক্তির চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সংকটও প্রকট। দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে দলটির ভেতর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিছু নেতা-কর্মীর মধ্যে রাতারাতি সম্পদ ও ক্ষমতা দখলের তীব্র প্রতিযোগিতা দলের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। বারবার নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাতিলের মহড়া বিএনপির এই দিশেহারা অবস্থাকে জনসমক্ষে আরও প্রকট করে তুলেছে।
এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএনপিকে এখন অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে। কেবল আবেগ বা অতীত গৌরবের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। দলের ভেতরে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরকার অদৃশ্য বাধার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক সংস্কারের পথ ধরতে হবে—কোনো হঠকারী বা আবেগী শুদ্ধি অভিযান নয়। জামায়াতের মতো ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তিকে পেশিশক্তি দিয়ে না ঠেকিয়ে আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা জরুরি। ক্ষমতা একটি ধারালো তরবারির মতো, যার সঠিক ব্যবহার না জানলে আত্মঘাতী পরিণতির সম্ভাবনা প্রবল। এই চরম পরীক্ষার সময়ে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে, কেবল ক্ষমতার মসনদ দখলই নয়, বরং জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রকৃত যোগ্যতাই তাদের রয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 























